নেপালে আঘাত হানা ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা, ধস ও ভূমিধসে প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় তিনশ ছুঁয়েছে এবং দেড় শতাধিক মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। মুহূর্তের মধ্যে নদীমাতৃক ও পাহাড়ি জনপদের জনজীবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আকস্মিক এই বিপর্যয়ে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটি শুধু হিমালয়কন্যা নেপালকেই স্তব্ধ করে দেয়নি, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার আবহাওয়াবিদ ও নীতিনির্ধারকদের কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াল থাবায় যেভাবে অপ্রতিরোধ্য গতিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি ঘটছে, এ বন্যা তারই এক নিদারুণ ও নির্মম বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে বর্ষার স্বাভাবিক মেজাজ হারিয়ে যেভাবে হুট করে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের সৃষ্টি হচ্ছে, তা জনজীবনকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ক্ষয়ক্ষতির পেছনে কেবল আবহাওয়ার চরমভাবাপন্ন রূপই দায়ী নয়, বরং অপরিকল্পিত নগরায়ন, পাহাড় কেটে বসতি ও রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং নদী ব্যবস্থাপনার চরম দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, পাহাড়ি অঞ্চলের ভঙ্গুর ভূ-প্রকৃতিকে উপেক্ষা করে যত্রতত্র ভারী স্থাপনা গড়ে তোলায় বৃষ্টিপাতের তীব্রতা বৃদ্ধির সাথে সাথেই পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে নেমে আসছে। এর পাশাপাশি জলবায়ুর পরিবর্তনে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়া এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস ব্যবস্থার আধুনিকায়নের ঘাটতি সাধারণ মানুষকে সময়মতো নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে উদ্ধারকাজ শুরু হতে না হতেই বহু মূল্যবান প্রাণহানি ঘটে গেছে। এই মর্মান্তিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ কোনো ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। হিমালয় অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং আকস্মিক দুর্যোগের পূর্বাভাস প্রদানে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক তথ্য বিনিময় ও যৌথ গবেষণার পরিধি আরো বাড়াতে হবে। পাহাড়ি ঢল ও নদীমাতৃক এই অঞ্চলে আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বৈশ্বিক তহবিল ও প্রযুক্তিগত সহায়তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
বলা বাহুল্য, নেপালের সাম্প্রতিক ওই বিপর্যয় প্রমাণ করে- পাহাড়ি অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি এখন আর কোনো দূরবর্তী আশঙ্কা নয়; বরং দোরগোড়ায় কড়া নাড়া এক বর্তমান বাস্তবতা। অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং নদী ও পাহাড়ি ঢালের কাছাকাছি বসতি স্থাপন এ বিপদকে আরো বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই সংকটময় মুহূর্তে নেপাল সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো মানবিক সহায়তা ও সমন্বিত উদ্ধার কার্যক্রম অত্যন্ত জরুরি। নিখোঁজ ব্যক্তিদের দ্রুত উদ্ধার এবং দুর্গতদের মধ্যে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছানোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার নদীমাতৃক ও পাহাড়ি দেশগুলোকে ভবিষ্যতের এমন আকস্মিক দুর্যোগ মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক আবহাওয়া সতর্কবার্তা এবং নদী অববাহিকাভিত্তিক তথ্যবিনিময়ে একযোগে কাজ করতে হবে।
আমরা মনে করি, হিমালয়ের পরিবেশ রক্ষা ও টেকসই অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল নেপালের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে মানবসভ্যতা ও প্রকৃতিকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব। নেপালের ওই শোকাবহ ঘটনা যেন কেবল একটি সংবাদ শিরোনামে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং পুরো অঞ্চলের পরিবেশ সুরক্ষায় নীতিনির্ধারকদের জোরালো পদক্ষেপের একটি নতুন সূচনা ঘটায়। আমাদের প্রত্যাশা, এই ভয়াবহতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আঞ্চলিক সমন্বিত দুর্যোগ মোকাবিলা কৌশল অবলম্বনে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে নেপাল কর্তৃপক্ষ।
কেএমএএ/আপ্র/২৭.০৮.২০২৬