গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

উপকূলের নোনা জলে বিপন্ন হৃদয়-মস্তিষ্ক ও অর্থনীতি

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ০০:৫৫ পিএম, ২৭ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ০০:৩৭ এএম ২০২৬
উপকূলের নোনা জলে বিপন্ন হৃদয়-মস্তিষ্ক ও অর্থনীতি
ছবি

ফাইল ছবি

বাংলাদেশের উপকূল যেন ধীরে ধীরে এক অদৃশ্য পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। নদীর পানি নোনা হচ্ছে, মাটিতে লবণ জমছে, পুকুরের মিঠা পানি হারিয়ে যাচ্ছে, কৃষিজমি বদলে যাচ্ছে মাছের ঘেরে। বাইরে থেকে এটিকে হয়তো জীবিকার পরিবর্তন কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাভাবিক অভিঘাত বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এর গভীরে রয়েছে আরো ভয়ংকর বাস্তবতা-একটি পরিবেশগত সংকট ক্রমে রূপ নিচ্ছে জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় অর্থনীতির নীরব সংকটে।

সাম্প্রতিক এক গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল সেই শঙ্কাকেই নতুন মাত্রা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ এবং ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের যৌথ গবেষণায় খুলনার কয়রা ও সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার ১৭২টি গ্রামের ২৭ হাজার ৬৯৭টি পানির উৎস পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে খাবার পানি হিসেবে ব্যবহৃত ৬ হাজার ৭০৩টি উৎসের কয়রায় ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৩ শতাংশে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে। দুই উপজেলার ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী ১৫ হাজার ৪৭১ জনের স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়নে দেখা গেছে, ২১ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের আগামী দশ বছরে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার হৃদরোগ কিংবা স্ট্রোকের ঝুঁকি রয়েছে।

অবশ্যই গবেষকেরা লবণাক্ত পানি এবং হৃদরোগ বা স্ট্রোকের মধ্যে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক দাবি করেননি। বৈজ্ঞানিক সতর্কতার এই অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয় যে, একই ভৌগোলিক অঞ্চলে একদিকে ব্যাপক খাবার পানির লবণাক্ততা, অন্যদিকে উল্লেখযোগ্য হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি পাওয়া গেছে। এর আগে পরিচালিত গবেষণাতেও উপকূলীয় খাবার পানির লবণাক্ততার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। একটি অনুসরণমূলক গবেষণায় খাবার পানির সোডিয়াম কমার সঙ্গে রক্তচাপ হ্রাস এবং উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমার সম্পর্কও দেখা গেছে।

অর্থাৎ নোনা পানি এখন আর কেবল স্বাদের সমস্যা নয়; এটি মানুষের শরীরে অতিরিক্ত সোডিয়াম প্রবেশের একটি সম্ভাব্য পথ। দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপ বাড়ায়, আর উচ্চ রক্তচাপ হৃদ্রোগ, স্ট্রোক ও কিডনি রোগের অন্যতম প্রধান ঝুঁকি। দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানুষের খাবার পানিতে সোডিয়ামের উপস্থিতি নিয়ে আগের গবেষণায় কিডনি ক্ষতির ঝুঁকির সঙ্গেও সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

এখানে জলবায়ু পরিবর্তন সংকটকে আরো তীব্র করে তুলছে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম এবং মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়া সেই লবণাক্ততাকে দীর্ঘস্থায়ী করে। একবার নোনা পানি ঢুকলে শুধু পানির উৎস নয়, মাটির উর্বরতা, উদ্ভিদ, প্রাণী, কৃষি ও স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় উপকূলীয় বাংলাদেশে লবণাক্ততার কারণে ধানের উৎপাদন ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে।

কিন্তু এখানেই আরেকটি কঠিন প্রশ্ন সামনে আসে। লবণাক্ত জমিতে লবণপানির চিংড়ি চাষ অনেক ক্ষেত্রে কৃষকের তাৎক্ষণিক আয় বাড়ায়। সাতক্ষীরায় উন্নত পদ্ধতিতে বাগদা চিংড়ি চাষে প্রতি বিঘায় ৭০ থেকে ৯০ হাজার টাকার মাছ বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে; কিছু ক্ষেত্রে মৎস্য কর্মকর্তারা আরো বেশি লাভের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন। জেলার প্রায় ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ৫৮ হাজার লবণপানির ঘেরে বাগদা চাষের তথ্যও পাওয়া যায়।

কিন্তু এই হিসাবের সঙ্গে একটি বড় সতর্কতা যুক্ত করা জরুরি। চিংড়ির তাৎক্ষণিক ব্যক্তিগত মুনাফা আর একটি এলাকার দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক-অর্থনৈতিক লাভ এক জিনিস নয়। চিংড়ি চাষের ঘেরে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করিয়ে যদি পাশের কৃষিজমি, মিঠাপানির পুকুর, গবাদিপশুর পানির উৎস ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সেই ক্ষতির মূল্যও অর্থনীতির হিসাবে ধরতে হবে। গবেষণায় উপকূলীয় চিংড়ি চাষের পরিবেশগত ব্যয়ের কথাও উঠে এসেছে; জলাভূমি ও কৃষিজমির ব্যবহার, কৃষির সুযোগ হ্রাস এবং বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি বাজারদরের হিসাবে ধরা না পড়ায় প্রকৃত সামাজিক ব্যয় আড়ালে থেকে যায়।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে-স্থানীয় কিছু পরিবেশ বিষয়ে উদাসীনদের সাথে রাষ্ট্র কি শুধু তাৎক্ষণিক বেশি মুনাফার হিসাব করবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সম্পদের হিসাবও করবে?

যদি কোনো এলাকায় চিংড়ি চাষে একজন কৃষক আজ বেশি আয় করেন, কিন্তু সেই জমিতে আগামী কয়েক দশক ধান, সবজি, ডাল, ফল কিংবা গবাদিপশুর খাদ্য উৎপাদনের সুযোগ নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে জাতীয় অর্থনীতির দৃষ্টিতে সেই আয়কে নিঃশর্ত সাফল্য বলা যায় না। একইভাবে একটি ঘের থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা মূল্যবান হলেও যদি তার বিনিময়ে মিঠা পানির উৎস নষ্ট হয়, কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা কমে, মানুষ অসুস্থ হয় এবং ভবিষ্যতে পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসেবায় রাষ্ট্রকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়, তাহলে সেই ক্ষতিও জাতীয় আয়-ব্যয়ের বৃহত্তর হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

এই কারণেই উপকূলের জন্য এখন একটি সুস্পষ্ট মিঠাপানি পুনরুদ্ধার ও লবণাক্ততা ব্যবস্থাপনা নীতি প্রয়োজন। কোন এলাকায় লবণপানির চাষ হবে, কোথায় কৃষিজমি ও মিঠাপানির জলাধার সংরক্ষিত থাকবে, কোথায় সমন্বিত মাছ-কৃষি ব্যবস্থা গড়ে উঠবে-তা বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। শুধু চিংড়ির লাভ নয়, ধান, সবজি, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মিঠাপানির মাছ, কর্মসংস্থান, খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের সম্মিলিত মূল্যায়ন করে ভূমি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

মিঠাপানির চাষে ফিরে যাওয়ার সুযোগ যেখানে আছে, সেখানে সরকারকে কৃষককে শুধু উপদেশ দিলে চলবে না; প্রয়োজন সেচের পানি, লবণসহিষ্ণু ও স্বল্পমেয়াদি ফসল, উন্নত বীজ, ভর্তুকি, সহজ ঋণ, বাজারসংযোগ এবং ফসলের ন্যায্যমূল্যের নিশ্চয়তা। একই সঙ্গে লবণাক্ততার প্রবেশ ঠেকাতে বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণ, খাল ও নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধার এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন।

উপকূলের মানুষকে শুধু চিংড়িচাষি কিংবা জলবায়ু উদ্বাস্তু হিসেবে দেখার মানসিকতা বদলাতে হবে। তাঁরা দেশের খাদ্য উৎপাদক, শ্রমশক্তি, মৎস্যসম্পদের রক্ষক এবং জাতীয় অর্থনীতির অংশীদার। তাঁদের জমি ও পানি আজ নষ্ট হলে আগামী দিনের জাতীয় উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সরকারের সামনে তাই দ্বিমুখী দায়িত্ব। একদিকে নিরাপদ খাবার পানি নিশ্চিত করে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি রোগের সম্ভাব্য ঝুঁকি কমাতে হবে; অন্যদিকে লবণাক্ততার বিস্তার ঠেকিয়ে কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের উৎপাদনভিত্তি রক্ষা করতে হবে। স্বাস্থ্য, কৃষি, মৎস্য, পানি, পরিবেশ, স্থানীয় সরকার ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে আলাদা আলাদা কর্মসূচিতে আটকে রাখলে চলবে না।

আজ উপকূলের নোনা পানি আমাদের একটি কঠিন শিক্ষা দিচ্ছে-প্রকৃতির সঙ্গে এক খাতে করা ভুল অন্য খাতে গিয়ে তার মূল্য আদায় করে। যে লবণাক্ততা আজ কৃষকের জমি বদলে দিচ্ছে, কাল তা মানুষের পানিতে ঢুকছে; যে পানি আজ শরীরে অতিরিক্ত লবণ পৌঁছে দিচ্ছে, কাল তা হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের বোঝা বাড়াতে পারে; আর যে পরিবেশ আজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তার পুনর্গঠনের ব্যয় শেষ পর্যন্ত বহন করবে পুরো দেশ।

অতএব উপকূল রক্ষার নীতি হতে হবে মানুষের জীবন, পরিবেশ এবং অর্থনীতিকে একসঙ্গে দেখার নীতি। চিংড়ি থাকবে, কিন্তু অপরিকল্পিত লবণাক্ততা নয়; উন্নয়ন থাকবে, কিন্তু মিঠাপানি ধ্বংস করে নয়; আয় থাকবে, কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পদ বন্ধক রেখে নয়। এখনই যদি রাষ্ট্র মিঠাপানি রক্ষা, নিরাপদ পানি নিশ্চিতকরণ এবং টেকসই ভূমি ব্যবহারের সুস্পষ্ট পথনকশা তৈরি না করে, তবে উপকূলের নোনা জল একদিন শুধু মানুষের হৃদয় ও মস্তিষ্কের জন্য নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের জন্যও এক গভীর অশনিসংকেতে পরিণত হবে।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, দৈনিক আজকের প্রত্যাশা
সানা/আপ্র/২৭/৮/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

দুর্গাপূজা: ভক্তির আয়োজন, অর্থনীতির বিস্তার
২০ অক্টোবর ২০২৬

দুর্গাপূজা: ভক্তির আয়োজন, অর্থনীতির বিস্তার

শোয়েব সাম্য সিদ্দিকদুর্গাপূজা এলেই ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি জমে ওঠে কেনাকাটা ও ব্যবসা-বাণিজ্য। নতুন প...

পিটিয়ে হত্যার সাহস পায় কোথায়, রাষ্ট্র কি তবে মবের কাছে জিম্মি?
২০ অক্টোবর ২০২৬

পিটিয়ে হত্যার সাহস পায় কোথায়, রাষ্ট্র কি তবে মবের কাছে জিম্মি?

আবু আহমেদ ফয়জুল কবিরসাতক্ষীরার দেবহাটায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পিটিয়ে হত্য...

ক্ষমতা বদলায়, রাষ্ট্র কি বদলায়?
১৯ অক্টোবর ২০২৬

ক্ষমতা বদলায়, রাষ্ট্র কি বদলায়?

মীর আরিফ হোসেনবাংলাদেশে সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাস বদলেছে, মানুষের প্রত্যাশাও বারবার নতু...

মৃত্যুদণ্ড শ্রমিকের, মুনাফা রাষ্ট্রের: অভিবাসী শ্রমিকের নেক্রোপলিটিক্স
১৯ অক্টোবর ২০২৬

মৃত্যুদণ্ড শ্রমিকের, মুনাফা রাষ্ট্রের: অভিবাসী শ্রমিকের নেক্রোপলিটিক্স

মারজিয়া প্রভারাষ্ট্র আসলে ঠিক করে দেয়, কে বাঁচবে আর কে মরবে! সব আইনি সুরক্ষা ও মর্যাদাকে ছিনিয়ে নিয়ে...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বাংলাদেশের মতো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিশ্বের কোথাও নেই: রাষ্ট্রপতি

বাংলাদেশে বিদ্যমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত বিশ্বের অন্য কোথাও নেই বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, বিশ্বজুড়ে যখন হানাহানি ও হিংসার আগুন জ্বলছে, তখন বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ দুর্গাপূজা উদযাপন করতে পারছেন। রোববার (১৮ অক্টোবর) শারদীয় দুর্গোৎসব ও বিজয়া দশমী ২০২৬ উপলক্ষ্যে ঢাকার রমনা কালীমন্দির পরিদর্শনকালে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে