নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১৫৭ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন শত শত মানুষ। নেপালের পর্যটন বোর্ডের হিসাবে, শুধু দেশটিতেই ৪০৩ জনের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না; তাঁদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিক। এদিকে চীনের তিব্বত অঞ্চলেও ভূমিধসে অন্তত তিনজন নিহত এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এই দুর্যোগে মোট প্রাণহানি ১৬০ ছাড়িয়েছে।
নেপালের উত্তরাঞ্চলীয় রসুয়া ও আশপাশের জেলাগুলোতে বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে ভোতে কোশি নদীতে হঠাৎ ভয়াবহ পানির ঢল নামে। মুহূর্তের মধ্যে নদীতীরের জনবসতি, বাজার, সড়ক, সেতু, যানবাহন ও জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো ভেসে যায় বা কাদার নিচে চাপা পড়ে। নুয়াকোট, ধাদিং, চিতওয়ান, গোর্খা, তানাহুঁ ও নওয়ালপুরসহ ভাটির বিস্তীর্ণ এলাকাতেও বন্যার প্রভাব পড়ে।
ভূমিকম্পের তিন মিনিট পরই ঢল
দুর্যোগটির সঙ্গে একটি ভূমিকম্পের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল পার্লামেন্টে জানিয়েছেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ওই এলাকায় ভূমিকম্প হয় এবং প্রায় তিন মিনিট পর, সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে আকস্মিক বন্যা শুরু হয়। তবে ভূমিকম্পটিই সরাসরি বন্যার কারণ কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও উপগ্রহচিত্রের প্রাথমিক পর্যালোচনায় অবশ্য আরও একটি সম্ভাব্য কারণ সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় হিমবাহের একটি বড় অংশ ভেঙে নিচে পড়ে বরফ, পাথর ও কাদার বিশাল স্রোত তৈরি করে। সেটি লেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে দিয়ে আকস্মিকভাবে বিপুল পানি ও ধ্বংসাবশেষ ভাটিতে নামিয়ে দেয়। ওই ধাক্কায় ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীব্যবস্থায় ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হয়।
নেপালের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, লেন্দে নদীতে বরফ, পাথর ও ভূমিধসের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি আকস্মিক প্রবাহ থেকেই বিপর্যয়টির সূত্রপাত হয়েছে। ফলে ‘ভূমিকম্পের তিন মিনিট পর বন্যা’—এই সময়গত সম্পর্কটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও বন্যার চূড়ান্ত কারণ হিসেবে ভূমিকম্পকে এখনই নিশ্চিতভাবে দায়ী করা যাচ্ছে না।
রসুয়ায় নিশ্চিহ্ন জনপদ
রসুয়া জেলার তিমুরে, স্যাব্রুবেসি, মাইলুং ও রসুয়াগাধি এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি সবচেয়ে ভয়াবহ। রসুয়াগাধি সীমান্ত চৌকির কাছে থাকা শত শত যানবাহন ও ট্রাক পানির তোড়ে ভেসে গেছে। নদীর তীরবর্তী বসতিগুলোর অনেকটাই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই বিশাল ঢেউয়ের মতো পানি ও কাদার স্রোত নেমে আসে।
রসুয়ায় নিশ্চিহ্ন জনপদ -রয়টার্স
কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে রসুয়া জেলার প্রধান শুল্ক কর্মকর্তা রাজেন্দ্র ধুঙ্গানার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, তিনি প্রথমে ভূমিকম্প হয়েছে বলে মনে করেছিলেন। পরে দেখতে পান, উজান থেকে প্রায় ১০০ মিটার উঁচু ঢেউয়ের মতো পানি ও ধ্বংসাবশেষ বাজারের দিকে ধেয়ে আসছে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বাজারের বড় অংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং সীমান্তে অপেক্ষমাণ তিন শতাধিক যানবাহন ভেসে যায়।
উপগ্রহচিত্রের প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ২০ কিলোমিটার উজানে বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ ভেঙে নদীতে পড়ে এই বিপুল ধ্বংসাবশেষের স্রোত তৈরি হতে পারে। ভাটির দিকে গালছি এলাকায় মাত্র ৩০ মিনিটে নদীর পানি প্রায় ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।
নিখোঁজ ৪০৩, অধিকাংশ বিদেশি
নেপাল পর্যটন বোর্ডের সর্বশেষ হিসাবে, দেশটিতে ৪০৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি এবং ৬২ জন নেপালি নাগরিক। নিখোঁজদের মধ্যে ২০৩ জন পুরুষ ও ২০০ জন নারী। বিদেশিদের মধ্যে ভারতের ১৩৩ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন এবং কানাডার ২৪ জন রয়েছেন। অন্তত ২৬টি দেশের নাগরিকের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
নিখোঁজদের একটি বড় অংশ তিব্বতের পবিত্র কৈলাস-মানস সরোবরের উদ্দেশে যাত্রা করছিলেন। একই সময়ে স্থানীয় ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে রসুয়ার গোসাইকুণ্ড এলাকায় বিপুলসংখ্যক নেপালি তীর্থযাত্রী ও পর্যটকও ছিলেন। ফলে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা আরও পরিবর্তিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
নেপাল পুলিশের সদস্যদেরও নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। রসুয়ার বিভিন্ন নিরাপত্তা চৌকি থেকে কয়েক ডজন পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী, শুল্ককর্মীসহ স্থানীয় বাসিন্দারাও নিখোঁজ রয়েছেন।
বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত
বন্যা ও ভূমিধসে নেপালের বিদ্যুৎ অবকাঠামোও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির জ্বালানি কর্তৃপক্ষের হিসাবে জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ মিলিয়ে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থায় ক্ষয়ক্ষতির কারণে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
বন্যার তোড়ে সেতু ও সড়ক ধসে পড়ায় রসুয়া ও আশপাশের দুর্গত এলাকায় স্থলপথে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় মোবাইল যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন। ফলে নিখোঁজ ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণ এবং ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
উদ্ধারে নেপাল-চীনের ব্যাপক তৎপরতা
নেপাল সেনাবাহিনী ও পুলিশ হেলিকপ্টার, উদ্ধারকারী দল ও চিকিৎসাকর্মী মোতায়েন করেছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের কারণে অনেক এলাকায় হেলিকপ্টার অবতরণও কঠিন হয়ে পড়ছে। এরই মধ্যে শতাধিক মানুষকে উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
চীনও তিব্বতের গিরং এলাকায় উদ্ধার অভিযান জোরদার করেছে। দেশটির সরকারি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ভূমিধসে গিরং সীমান্ত বাণিজ্যকেন্দ্রের সড়ক, যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চীন ৫৭৪ জন উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে এবং আকাশপথে উদ্ধার ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে ড্রোন ও অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহার করছে।
চীনের তিব্বত অঞ্চলের গিরং কাউন্টিতে ভূমিধসে অন্তত তিনজন নিহত এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ থাকার কথা জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম। সীমান্তের বাণিজ্যকেন্দ্রটির সঙ্গে সড়ক যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
ভারতের উত্তরাঞ্চলেও সতর্কতা
হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় ভারতের উত্তর প্রদেশ ও বিহারেও বন্যা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিহারের কয়েকটি জেলা থেকে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং আরও ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
এদিকে নেপালের কর্মকর্তারা ভোতে কোশি, ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরে যেতে বলেছেন। উজানে ধ্বংসাবশেষ বা বরফ-পাথরের বাধা রয়ে যাওয়ায় নতুন করে ঢল নামার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
হিমালয়ে বাড়ছে দুর্যোগের ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়া, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং চরম আবহাওয়ার প্রবণতা বাড়ায় এ ধরনের আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস ও হিমবাহধসের ঝুঁকি বাড়ছে। রয়টার্সের উদ্ধৃত বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নেপালের হিমবাহগুলো গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য হারে বরফ হারিয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে গলনের গতি আরও বেড়েছে।
গত বছরও একই অঞ্চলে হিমবাহ-সম্পর্কিত আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানি ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। এবারের দুর্যোগ সেই ঝুঁকিকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
নেপালের এই বিপর্যয়ে এখনো উদ্ধার অভিযান চলছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকা, ধ্বংসস্তূপ ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে ১৫৭ জনের প্রাণহানির বর্তমান হিসাবকে চূড়ান্ত মনে করার সুযোগ নেই; পরিস্থিতি এখনো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি, এপি, কাঠমণ্ডু পোস্ট
সানা/আপ্র/২৭/৮/২০২৬