নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী রসুয়া জেলায় ভোতে কোশি নদীতে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ৯৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় এখনো ৪০৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে দেশি-বিদেশি পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন। দুর্গত এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান ব্যাহত হচ্ছে। খবর বিবিসির।
বুধবার (২৬ আগস্ট) স্থানীয় সময় সকালে তিব্বতের দিক থেকে ভোতে কোশি নদীতে হঠাৎ পানির প্রবল স্রোত নেমে আসে। এর সঙ্গে কাদামাটি ও পাথরের স্রোত যুক্ত হয়ে রসুয়া জেলার তিমুরে, স্যাব্রুবেসি ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, যানবাহন ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর পাশাপাশি কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে নেপালের বিভিন্ন সরকারি সংস্থা হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা কম জানিয়েছিল। পরে উদ্ধার অভিযান এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে মৃতদেহ উদ্ধারের সংখ্যা দ্রুত বাড়ে। নেপালের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর সর্বশেষ ৯৫টি মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেছে। একই সময়ে পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, ৪০৩ জনের এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
পর্যটন বোর্ডের তথ্যমতে, নিখোঁজদের মধ্যে ৬১ জন নেপালি এবং ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিক। তাঁদের মধ্যে ২০০ জন নারী ও ২০৩ জন পুরুষ। ভারতের ১৩৩ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ জন এবং যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন নাগরিকও নিখোঁজ তালিকায় রয়েছেন। এ তালিকায় অন্তত ২৬টি দেশের নাগরিক রয়েছেন।
পানির তোড়ে নদীর তীরের জনবসতিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অনেক জায়গায় আস্ত গ্রাম ভেসে গেছে -ছবি এএফপি
নিখোঁজ বিদেশিদের বড় একটি অংশ তিব্বতের মানস সরোবর ও কৈলাস পর্বত এলাকায় যাওয়ার পথে রসুয়া দিয়ে যাত্রা করছিলেন। পর্যটন ও ভ্রমণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিখোঁজদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তালিকাটি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে; ফলে সংখ্যা ও পরিচয়ের তথ্য পরবর্তী সময়ে পরিবর্তিত হতে পারে।
উদ্ধার তৎপরতা
নেপাল সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য উদ্ধারকারী দল দুর্গত এলাকায় অনুসন্ধান চালাচ্ছে। সেনাবাহিনী জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ৮৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আহত কয়েকজনকে কাঠমান্ডুর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। উদ্ধার অভিযানে সেনাবাহিনী ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একাধিক হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থার কারণে উদ্ধারকাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
রসুয়া জেলার তিমুরে ও স্যাব্রুবেসি এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সীমান্তের সঙ্গে সংযোগকারী সড়ক ও সেতুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ওই অঞ্চলে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে। নদীর পানির প্রবল স্রোতে বিভিন্ন স্থাপনা ভেসে গেছে এবং নদীতীরবর্তী কয়েকটি জনবসতিতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে।
নুয়াকোট ও ধাদিংসহ ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর ভাটির এলাকাতেও আকস্মিক পানির উচ্চতা বেড়ে যায়। এতে নদীতীরবর্তী বসতি, বাজার, সেতু ও বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রকল্পকর্মীরাও নিখোঁজ
দুর্যোগে স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মীরাও নিখোঁজ হয়েছেন। রসুয়া জেলার তিমুরে এলাকায় নেপাল পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশের ৩২ সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। এ ছাড়া লাংটাং খোলা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৬০ কর্মীরও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শেষ হয়ে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতি চলছিল।
রসুয়া শুল্ক কার্যালয়ের ১৫ কর্মীর সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা।
প্রধানমন্ত্রীর শোক
দুর্যোগে প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিতে গভীর শোক জানিয়েছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি বলেন, আকস্মিক এই ভয়াবহ দুর্যোগে পুরো জাতি স্তম্ভিত ও গভীরভাবে মর্মাহত। নিহত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁদের স্বজনদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী জানান, উদ্ধার ও ত্রাণকাজে সরকারের সব ধরনের সক্ষমতা তাৎক্ষণিকভাবে কাজে লাগানো হয়েছে। চিকিৎসক দল, স্বেচ্ছাসেবী ও মানবিক সহায়তাকারী সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে দুর্গত এলাকায় জরুরি কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
এদিকে তিব্বতের দিকেও বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। চীনা কর্তৃপক্ষও সীমান্তবর্তী এলাকায় উদ্ধার ও জরুরি তৎপরতা চালাচ্ছে। নদীর উজানে আবার পানি ও ধসের ঝুঁকি থাকায় ভাটির এলাকাগুলোতেও সতর্কতা জারি রাখা হয়েছে।
নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর অনেক স্থানে এখনো উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারেনি। ফলে মৃত, নিখোঁজ ও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণে আরও সময় লাগবে।
সানা/আপ্র/২৬/৮/২০২৬