গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

দিন-রাত সমান, ঢাকায় ছিনতাইকারীদের দাপট থামছে না

নিজেস্ব প্রতিবেদক

নিজেস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৭:১৫ পিএম, ২৬ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ০১:৪৬ এএম ২০২৬
দিন-রাত সমান, ঢাকায় ছিনতাইকারীদের দাপট থামছে না
ছবি

এআই দ্বারা নির্মিত প্রতীকী ছবি

রাজধানীতে ছিনতাই এখন আর রাতের অন্ধকার কিংবা নির্জন সড়কের অপরাধে সীমাবদ্ধ নেই। ব্যস্ত সড়কে দিনদুপুরেও অস্ত্র হাতে সক্রিয় হচ্ছে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্র। ব্যাংকে জমা দিতে নেওয়া সোয়া কোটি টাকা ছিনিয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে প্রকাশ্যে ব্যবসায়ীকে গুলি করে ডলার লুট, চলন্ত যানবাহন থেকে মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়া কিংবা বাধা দিলে ধারালো অস্ত্রের আঘাত—একটির পর একটি ঘটনায় নগরবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

গত ৯ আগস্ট সকালে উত্তরায় ব্যাংকে জমা দিতে যাওয়ার পথে ডিএল ফিলিং স্টেশনের ১ কোটি ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা রাজধানীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে। তিনটি মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা টাকা বহনকারী গাড়ির গতিরোধ করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়ে টাকার ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায়।

ঘটনাটি নিয়ে বিমানবন্দর থানায় মামলা হয়। পরে পুলিশ ও র‌্যাবের অভিযানে ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনাটি রাজধানীতে পরিকল্পিত ও সংঘবদ্ধ ছিনতাইয়ের ভয়াবহতা সামনে নিয়ে আসে।

এর আগে ২৬ জুন মতিঝিলের শাপলা চত্বর এলাকায় জনতা ব্যাংকের সামনে প্রকাশ্যে এক মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীকে গুলি করে ১৭ হাজার ডলার ছিনিয়ে নেওয়া হয়। বেলা ৩টার দিকে মো. লোকমান নামের ওই ব্যবসায়ী ছিনতাইকারীদের হামলায় আহত হন। দুই দুর্বৃত্ত তাঁর ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাঁকে গুলি করে ব্যাগ নিয়ে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায়।

ব্যস্ত সড়কেও অস্ত্রধারীদের দাপট
নগরবাসীর অভিযোগ, সিএনজি অটোরিকশা, মোটরসাইকেল কিংবা ব্যক্তিগত গাড়িতে করে ছিনতাইকারীরা এখন ব্যস্ত সড়কেও হঠাৎ হাজির হচ্ছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই টাকা, মুঠোফোন বা মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে তারা। বাধা দিলে হামলা চালাতেও দ্বিধা করছে না।

সম্প্রতি মোহাম্মদপুরের আদাবর শেখেরটেকে একটি বিকাশ এজেন্টের দোকানে ধারালো চাপাতি নিয়ে প্রকাশ্যে হামলা চালায় দুই যুবক। এতে দোকান মালিক শফিকুল ইসলাম গুরুতর আহত হন। পরে ছিনতাইকারীদের আস্তানায় অভিযান চালাতে গেলে পুলিশের ওপরও হামলা হয়। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর ও উপপরিদর্শক তরুণ কুমার আহত হন। পরে ঘটনাস্থল থেকে চারজনকে আটক করা হয়।

এর কয়েক দিন আগে শেরেবাংলা নগর থানার জিয়া উদ্যান এলাকায় ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে হামলার শিকার হন পুলিশের দুই সদস্য। ১২ জুন রাতে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে আহত হন উপপরিদর্শক সামসুজ্জোহা ও কনস্টেবল হৃদয় হোসেন।

সম্প্রতি শাহবাগ পার হয়ে প্রেসক্লাব থেকে মিরপুরে সিএনজি অটোরিকশায় যাওয়ার সময় ছিনতাইয়ের চেষ্টার শিকার হন শাহাদাৎ হোসেন। তাঁর ভাষ্য, চলন্ত অটোরিকশার ওপর দিয়ে চাকু দিয়ে আঘাত করে মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সতর্ক থাকায় ফোনটি নিতে পারেনি ছিনতাইকারীরা।

তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তা এলাকায় ব্যক্তিগত গাড়িতে যাওয়ার সময় একই ধরনের ঘটনার মুখে পড়েন আরমান আহমেদ। তাঁর মুঠোফোন টান দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও সতর্ক থাকায় সেটি রক্ষা পায়। তাঁর অভিযোগ, ওই সড়কে মাঝেমধ্যেই এ ধরনের ঘটনা ঘটে।

ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে দুই নারীর মৃত্যু

ছিনতাইকারীর হামলায় চলতি বছর রাজধানীতে দুই নারীর মৃত্যুর ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

৭ জুন গাবতলী থেকে বাসে নেমে ধানমন্ডির বাসার দিকে যাওয়ার পথে ছিনতাইকারীর হামলার শিকার হন সোহেলি ইসলাম। দুই ছিনতাইকারী তাঁর হাতে প্যাঁচানো ভ্যানিটি ব্যাগ ধরে টান দিলে তিনি সড়কে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন। চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তখনও কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।

এর আগে ১৯ মার্চ উত্তরায় ঈদের কেনাকাটার জন্য বাসা থেকে বের হওয়ার পর ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে গুরুতর আহত হন ২১ বছর বয়সী গৃহবধূ মুক্তা আক্তার। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

সাত মাসে ১৭৮ মামলা
ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১৭৮টি মামলা হয়েছে। জানুয়ারিতে ২৯টি, ফেব্রুয়ারিতে ২২টি, মার্চে ২৫টি, এপ্রিলে ২৫টি, মে মাসে ৩৩টি, জুনে ২৪টি এবং জুলাইয়ে ২০টি মামলা হয়েছে। সাত মাসের মধ্যে মে মাসে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে।

তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি মামলার সংখ্যা ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না। অনেক ভুক্তভোগী ঝামেলা এড়াতে মামলা করেন না, কেউ সাধারণ ডায়েরি করেন, আবার অনেকে হারানো মালামাল উদ্ধারের আশা না থাকায় কোনো আইনি পদক্ষেপই নেন না। ফলে প্রকৃত ছিনতাইয়ের সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রাজধানীতে শত শত ছিনতাইপ্রবণ স্থান
পুলিশের আগের তালিকায় রাজধানীতে ৩৪২টি ছিনতাইপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করা হয়েছিল। এসব এলাকায় প্রায় ১ হাজার ২০০ অপরাধী সক্রিয় থাকার তথ্যও দেওয়া হয়।

এর মধ্যে মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় ১০৮টি, বৃহত্তর মিরপুরে ৯৫টি, গুলশান ও উত্তরা এলাকায় ৯৪টি, মতিঝিল বিভাগে ৩০টি, ওয়ারীতে ৩৫টি এবং রমনা ও লালবাগ এলাকায় ৪৫টি ছিনতাইপ্রবণ স্থান ছিল।

পুলিশের আরেক তালিকায় ঢাকা মহানগর পুলিশের আট বিভাগে ১ হাজার ৩৮৭ ছিনতাইকারী সক্রিয় থাকার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রমনা বিভাগে ১৫২, লালবাগে ১৫৯, ওয়ারীতে ৩০৮, মতিঝিলে ১৬৮, তেজগাঁওয়ে ২৪০, মিরপুরে ৫৩, গুলশানে ৬৭ এবং উত্তরায় ২৪০ জন ছিনতাইকারীর নাম তালিকাভুক্ত রয়েছে।

অভিযান চলছে, দাবি পুলিশের

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, উত্তরার ছিনতাইয়ের ঘটনা শনাক্ত করে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মতিঝিলের ঘটনাতেও ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রাজধানীতে অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান বলেন, ছিনতাইকারী, টানাপার্টি, কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবারিসহ সব ধরনের অপরাধ দমনে পুলিশ কাজ করছে। প্রতিদিন অভিযান চালানো হচ্ছে এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার তানভির সরদার জানান, বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিন শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে; তাঁদের মধ্যে ছিনতাইকারী ও টানাপার্টির সদস্যও রয়েছে।

বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, বিমানবন্দর সড়কে আগের তুলনায় টহল বাড়ানো হয়েছে। বিমানবন্দর চৌরাস্তা মোড়েও সাদা পোশাক ও পোশাকধারী পুলিশ মোতায়েন থাকে। টানাপার্টি ও ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশের টহল বাড়ানোর পাশাপাশি ছিনতাইপ্রবণ এলাকায় নজরদারি ক্যামেরার আওতা বাড়ানো, চুরি যাওয়া মুঠোফোন দ্রুত শনাক্ত এবং তালিকাভুক্ত অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান ও কার্যকর তৎপরতাই রাজধানীবাসীর ছিনতাই-আতঙ্ক কমাতে পারে। 
সানা/আপ্র/২৬/৮/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

স্ত্রীর সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলা নিয়ে সন্দেহ, হত্যার পর পালাতে গিয়ে গ্রেফতার
১৩ অক্টোবর ২০২৬

স্ত্রীর সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলা নিয়ে সন্দেহ, হত্যার পর পালাতে গিয়ে গ্রেফতার

স্ত্রীর মুঠোফোনে সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলা নিয়ে সন্দেহ থেকে দাম্পত্য কলহের জেরে স্ত্রী বীথি আক্তারকে...

শাহজালালে আচারের বয়ামে দুই কোটি ৭০ লাখ টাকার মূল্যবান পাথর-স্বর্ণ
১১ অক্টোবর ২০২৬

শাহজালালে আচারের বয়ামে দুই কোটি ৭০ লাখ টাকার মূল্যবান পাথর-স্বর্ণ

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আচারের বয়ামের ভেতর থেকে হীরা, প্লাটিনাম, রুবি, স্বর্ণালংকার ও...

পরীক্ষায় পাস ও বিদেশে চাকরির প্রলোভনে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায়
১০ অক্টোবর ২০২৬

পরীক্ষায় পাস ও বিদেশে চাকরির প্রলোভনে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায়

বিদেশে চাকরি, কর্মী ভিসা ও লিখিত পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগে রাজধান...

শ্রীপুরে বিকাশের টাকা বহনকারী গাড়িতে গুলি, আড়াই কোটি টাকা ছিনতাই
০৯ অক্টোবর ২০২৬

শ্রীপুরে বিকাশের টাকা বহনকারী গাড়িতে গুলি, আড়াই কোটি টাকা ছিনতাই

গাজীপুরের শ্রীপুরে বিকাশের টাকা বহনকারী একটি প্রাইভেটকারে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে ক্যাশ ম্যানেজারকে গুল...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পরিচয় যা-ই হোক, চাঁদাবাজ-দখলদারদের ছাড় নয়: ডিএমপি কমিশনার

চাঁদাবাজ, ভূমি দখলবাজ ও মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় বা অবস্থান বিবেচনা না করে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ। এসব অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানো যাবে না বলেও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে ডিএমপি সদর দপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সেপ্টেম্বর মাসের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় উপস্থিত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এসব নির্দেশনা দেন কমিশনার। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন- কমিশনার যে নির্দেশনা দিয়েছেন, পুলিশ সদস্যরা তা বাস্তবে তা করতে পারবেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 ঘন্টা আগে