রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেঝে ও বারান্দায় শয্যা পেতে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার দৃশ্যটি কেবল একটি হাসপাতালের সক্ষমতার সংকট নয়; এটি সারাদেশে ডেঙ্গুর দ্রুত বিস্তারেরও একটি সতর্কসংকেত। ৪৮ শয্যার ডেঙ্গু ওয়ার্ডে গত মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) চিকিৎসাধীন ছিলেন ১২৭ জন—ধারণক্ষমতার প্রায় তিন গুণ। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিন শত শত নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ২৬ আগস্ট পর্যন্ত চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩১ হাজার ৩৮০ জন; মৃত্যু হয়েছে ৮৮ জনের। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরো ৫৫০ জন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ডেঙ্গুর প্রকোপ এখন শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন আক্রান্তদের মধ্যে ঢাকায় ৩৪৮ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১০২, ময়মনসিংহে ৪৫, খুলনায় ৩৮, রংপুরে ৮, বরিশালে ৬ এবং সিলেট বিভাগে ৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অর্থাৎ দেশের একাধিক অঞ্চলে একসঙ্গে সংক্রমণের চাপ বাড়ছে।
আগস্টে পরিস্থিতি আরো দ্রুত বদলেছে। চলতি মাসে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ইতোমধ্যে ১৬ হাজার ছাড়িয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু না হলেও এর আগের দিনগুলোতে একাধিক মৃত্যু ও বিপুলসংখ্যক নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ফলে সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাকে কোনোভাবেই স্বস্তির লক্ষণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
মুগদায় ধারণক্ষমতার তিন গুণ রোগী
মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে নির্ধারিত ৪৮টি শয্যার বিপরীতে মঙ্গলবার চিকিৎসা নিচ্ছিলেন ১২৭ জন। শয্যা না থাকায় অতিরিক্ত রোগীদের মেঝে ও বারান্দায় বিছানা পেতে স্যালাইন ও ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, ওয়ার্ডের প্রতিটি শয্যাই রোগীতে পূর্ণ।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২০ আগস্ট ডেঙ্গু নিয়ে ২০ জন, ২১ আগস্ট ৪০, ২২ আগস্ট ৩৬, ২৩ আগস্ট ৩৫ এবং ২৪ আগস্ট ৪৪ জন রোগী ভর্তি হন। ২৫ আগস্ট দুপুর ২টা পর্যন্ত আরো ২০ জন ভর্তি হন। অর্থাৎ অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই রোগী ভর্তির চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ডেঙ্গু ওয়ার্ডের উপপরিচালক নাসিমা জানান, জুলাই পর্যন্ত রোগীর চাপ তুলনামূলক কম ছিল। আগস্টে এসে হঠাৎ ভর্তি বেড়ে গেছে। সাধারণত রোগীকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগে; সংকটাপন্ন রোগীদের ক্ষেত্রে আরো বেশি সময় প্রয়োজন হয়। ফলে প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শয্যার ওপর চাপও বাড়ছে।
খিলগাঁও, মুগদা, বনশ্রী, টিকাটুলি, মান্ডা, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা, মাতুয়াইল, ডেমরা, জুরাইন, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ এলাকা থেকে মুগদা হাসপাতালে বেশি রোগী আসছেন। ঢাকার বাইরের রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম।
মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. সারা বলেন, বর্তমানে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ভর্তি রোগীদের মধ্যে তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্কের সংখ্যা বেশি; শিশু ও বয়স্ক রোগী তুলনামূলক কম। হাসপাতালে এ পর্যন্ত একজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
রোগীর কষ্ট, পরিবারের উৎকণ্ঠা
বাড্ডার বাসিন্দা স্বপন মিয়ার এক সপ্তাহ আগে জ্বর শুরু হয়। পরে বমি, মাথাব্যথা ও চোখের পেছনে তীব্র ব্যথা বাড়লে তিনি হাসপাতালে আসেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে। শয্যা না পাওয়ায় মেঝেতেই বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে তাঁকে। তীব্র ব্যথা ও বমির কারণে স্বাভাবিকভাবে খেতেও পারছেন না।
খিলগাঁওয়ের ২৫ বছর বয়সী তামান্না চার দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। তিনি জানান, বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখেন এবং নিয়মিত মশারি টানিয়ে ঘুমান। এরপরও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম আরো জোরদার করা প্রয়োজন। অসুস্থতার কারণে তাঁর শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা, খাবারে অরুচি ও দুর্বলতা দেখা দিয়েছে; সন্তানদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে।
শুধু রোগী বাড়ানো নয়, উৎস ধ্বংসেও জোর
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। রোগী শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বাড়ি ও আশপাশে অভিযান চালানোর পাশাপাশি কোথায় কোথায় এডিস মশার লার্ভা তৈরি হচ্ছে, তার নিয়মিত নজরদারি ও উৎস ধ্বংস জরুরি। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনাতেও কীটতত্ত্ববিদেরা রোগী শনাক্তের পাশাপাশি প্রজননস্থলভিত্তিক ব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম জানান, যেসব এলাকা থেকে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছেন, সেসব এলাকাকে অগ্রাধিকার দিয়ে মশক নিধন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। একাধিক দল মাঠে কাজ করছে এবং কার্যক্রম নিয়মিত তদারক করা হচ্ছে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোর কাজও চলছে।
চট্টগ্রামেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিশেষ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। নগরীর আটটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাসব্যাপী বিশেষ মশক নিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি তা তদারকিতে ১০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনও নিয়মিত মশক নিধনের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদারের কথা জানিয়েছে। ৭৫টি ওয়ার্ডে সকালে লার্ভিসাইডিং ও বিকেলে পূর্ণবয়স্ক মশা নিধনের কার্যক্রম চালানোর কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
বাড়ির ভেতরেও সতর্কতা জরুরি
ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় প্রশাসনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোসা, নির্মাণসামগ্রীর পাত্র, পানির ট্যাংকসহ যেসব স্থানে অল্প পরিমাণ পানি জমে থাকতে পারে, সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা জরুরি। কারণ এডিস মশা স্বচ্ছ ও জমে থাকা পানিতেই বংশবিস্তার করতে পারে।
পরিবারের একজন সদস্য ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তাঁকে মশারির ভেতরে রাখা এবং পরিবারের অন্য সদস্যদেরও মশারি ব্যবহার করা জরুরি। আক্রান্ত ব্যক্তিকে মশা কামড়ানোর পর সেই মশা অন্য ব্যক্তিকে কামড়ালে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে রোগীকে সুরক্ষিত রাখাও একই সঙ্গে সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
জ্বর হলেই অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পরও যদি তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা, শ্বাসকষ্ট বা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব দেখা দেয়, দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। ডেঙ্গুর জটিলতা অনেক সময় জ্বর কমার পরও দেখা দিতে পারে।
এখনই সমন্বিত উদ্যোগের সময়
দেশে এ বছর ইতোমধ্যে ৩১ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ৮৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিদিন নতুন রোগী যোগ হচ্ছে। রাজধানীর একটি হাসপাতালে ধারণক্ষমতার প্রায় তিন গুণ রোগী ভর্তি হওয়ার ঘটনা সেই চাপেরই দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি।
এ অবস্থায় রোগীর সংখ্যা আরো বাড়ার অপেক্ষায় না থেকে এখনই সমন্বিতভাবে মাঠে নামা জরুরি। মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস, নিয়মিত মশক নিধন, হাসপাতালের শয্যা ও চিকিৎসাসুবিধা প্রস্তুত রাখা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো এবং জনসচেতনতা জোরদার—সবগুলো কাজ একসঙ্গে করতে হবে।
কারণ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর সময় রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর নয়; মশার প্রজননস্থল তৈরি হওয়ার আগেই। রাজধানীর মেঝেতে শয্যা পেতে চিকিৎসা নেওয়া ১২৭ রোগীর দৃশ্য তাই দেশজুড়ে আগাম সতর্ক হওয়ার জন্য যথেষ্ট বড় বার্তা। এখনই ব্যবস্থা না নিলে হাসপাতালের শয্যার সংকট যেমন আরো তীব্র হতে পারে, তেমনি বাড়তে পারে প্রাণহানির ঝুঁকিও।
সানা/আপ্র/২৭/৮/২০২৬