সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। এই ছয় মাসে জনগণের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল-ভঙ্গুর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং রাষ্ট্রে সুশাসনের ভিত্তি দৃঢ় হবে। কিন্তু সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার একটি গভীর দূরত্ব তুলে ধরেছে। অর্থনীতির ৩১টি প্রধান সূচকের মধ্যে ১২টিতে অগ্রগতি হলেও ১৯টিতেই অবনতি হয়েছে। ফলে স্বস্তির জায়গাগুলোকে অস্বীকার না করেও বলতে হয়, সামগ্রিক চিত্রে আশাবাদের চেয়ে শঙ্কাই প্রবল।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, অর্থনীতি কেন কাঙিক্ষত গতিতে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। প্রবৃদ্ধি তিন শতাংশের নিচে নেমে যাওয়া, রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ তৈরি করছে। নিট বিদেশি বিনিয়োগও কমেছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র খোলার প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক অবস্থা থেকে ঋণাত্মক হয়েছে। অর্থাৎ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিবর্তে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার প্রবণতাই বাড়ছে।
রাজস্ব পরিস্থিতি আরো সতর্ক হওয়ার দাবি রাখে। চলতি অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একটি রাষ্ট্র যদি প্রয়োজনীয় রাজস্ব সংগ্রহ করতে না পারে, তাহলে উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো ও জনসেবায় কাঙিক্ষত অর্থায়ন নিশ্চিত করা কঠিন। তাই কর প্রশাসনের দক্ষতা, করজাল সম্প্রসারণ এবং কর ফাঁকি রোধে মৌলিক সংস্কার এখন আর বিলম্ব করার বিষয় নয়।
অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বৃদ্ধি ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধির উন্নতি স্বস্তিদায়ক। কিন্তু আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বাণিজ্য ঘাটতির প্রসার এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের গতি কমে যাওয়া দেখিয়ে দেয়-এই ইতিবাচক অর্জনগুলোকে স্থায়ী ভিত্তি দিতে আরো গভীর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সুশাসনের প্রশ্নটি আরো মৌলিক। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, সিন্ডিকেট ও মব সংস্কৃতি বন্ধের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে প্রতিফলিত না হলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষয়ে যায়। মেধার পরিবর্তে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে পদায়ন এবং নারী, শিশু ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় দৃশ্যমান প্রতিরোধের ঘাটতি কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা মানে কেবল কঠোরতা নয়; নিরপেক্ষতা, দ্রুত বিচার এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করাও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এ অবস্থায় বিচ্ছিন্ন সাফল্য দিয়ে সামগ্রিক সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সময়কার অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে একটি সমন্বিত তথ্যভিত্তিক দলিল না থাকার বিষয়টিও সংশোধন করা জরুরি। কারণ সঠিক রোগনির্ণয় ছাড়া কার্যকর চিকিৎসা সম্ভব নয়।
সিপিডি যে সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজ, বাস্তবভিত্তিক মূল বাজেট ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে, সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। জ্বালানি, ব্যাংকিং, রাজস্ব, সরকারি ব্যয়, উন্নয়ন কর্মসূচি, সরবরাহব্যবস্থা ও প্রশাসনিক সংস্কারকে আলাদা আলাদা দ্বীপে রেখে কাঙিক্ষত ফল মিলবে না। প্রয়োজন সুস্পষ্ট অগ্রাধিকার, নির্দিষ্ট সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান এবং নিয়মিত জনসম্মুখে অগ্রগতি প্রকাশ।
সরকারের হাতে এখনো সময় আছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মানুষের প্রত্যাশাও ফুরিয়ে যায়। তাই প্রতিশ্রুতির ভাষা নয়, এখন প্রয়োজন ফলাফলের দৃশ্যমানতা। অর্থনীতি ও সুশাসনে আজ যে সংস্কার শুরু হবে, তার সুফলই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের রাষ্ট্রের স্থিতি, মানুষের আস্থা এবং সরকারের ইতিহাসে অবস্থান।
সানা/আপ্র/২৭/৮/২০২৬