গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬

মেনু

রংপুরে চার খুন: জবানবন্দিতে বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

জেলা প্রতিনিধি, রংপুর

জেলা প্রতিনিধি, রংপুর

প্রকাশিত: ১৩:২৭ পিএম, ২৭ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১৫:১৮ এএম ২০২৬
রংপুরে চার খুন: জবানবন্দিতে বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য
ছবি

ছবি সংগৃহীত

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার দুই আসামির জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএ পরীক্ষা ও মাদকাসক্তি শনাক্তকরণ পরীক্ষা করা হবে। একই সঙ্গে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও আদালতে দেওয়া জবানবন্দির তথ্য যাচাই করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকাল ১০টায় সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।

তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হবে। পাশাপাশি তাদের মাদকাসক্তি শনাক্তকরণ পরীক্ষাও করা হবে।

পুলিশ কমিশনার বলেন, ময়নাতদন্তে গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তাদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধ বা গলায় ফাঁস দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। আসামিদের জবানবন্দির সঙ্গে ময়নাতদন্তের এসব তথ্যেরও মিল পাওয়া গেছে।

মাদক সেবনের পর ছাদে অবস্থান

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সিদ্ধার্থ জানিয়েছেন, ঘটনার আগের এক মাস ধরে তিনি প্রতি বৃহস্পতিবার ইয়াবা সেবন করতেন। ঘটনার রাতে ইয়াবা নিয়ে তিনি মুগ্ধকে সঙ্গে করে সীমান্ত দাসের বাসায় যান। সেখানে দুজন মিলে ইয়াবা সেবন করেন।

রাত ৩টার দিকে আরো ইয়াবা সেবনের জন্য তারা মাদক ব্যবসায়ী শান্তর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে তার বাড়ির সামনে থেকে আরো চারটি ইয়াবা সংগ্রহ করেন। এ সময় মোবাইল ফোন বন্ধক রাখেন তারা।

এরপর সীমান্তের বাসা থেকে বের হয়ে কুকুরের কারণে প্রধান ফটক দিয়ে না গিয়ে দেয়াল টপকে পাশের দেবুদের বাড়িতে প্রবেশ করেন। সেখানকার ছাদ থেকে মাত্র দুই থেকে আড়াই ফুট দূরের গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান তারা।

পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তীর ছাদের চারপাশে হাফওয়াল থাকায় বাইরে থেকে সহজে দেখা যেত না। পানির ট্যাংকির আড়ালে বসে তারা ইয়াবা সেবন করতে থাকেন। একপর্যায়ে ভোর হয়ে গেলেও বিষয়টি তারা খেয়াল করেননি।

সিদ্ধার্থের জবানবন্দিতে ওই রাতে মোট আটটি ইয়াবা সেবনের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে মুগ্ধের জবানবন্দিতে এসেছে নয়টি ইয়াবা সেবনের তথ্য।

গণপতিকে দেখে ফেলায় হত্যার সিদ্ধান্ত

ভোরে ছাদে হাঁটতে গিয়ে গণপতি চক্রবর্তী তাদের দেখে ফেলেন। তিনি তাদের ধমক দিয়ে জানতে চান, এত সকালে সেখানে তারা কী করছেন। এ নিয়ে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে তারা আশঙ্কা করেন, গণপতি চিৎকার করে বিষয়টি অন্যদের জানিয়ে দেবেন।

জবানবন্দি অনুযায়ী, এরপর তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। তারা গণপতি চক্রবর্তীর গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেন। একপর্যায়ে তাঁর মৃত্যু হয়।

পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্তে পাওয়া শ্বাসরোধজনিত মৃত্যুর তথ্যের সঙ্গে আসামিদের এই বক্তব্যের মিল রয়েছে।

স্ত্রী ও মেয়েকেও হত্যা

গণপতির মরদেহ টিন দিয়ে ঢেকে রাখার সময় শব্দ পেয়ে তার স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে চলে আসেন। তারা চিৎকার শুরু করলে মুগ্ধ প্রীতিলতার গলা চেপে ধরেন এবং সিদ্ধার্থ আগামী চক্রবর্তীর গলা চেপে ধরেন।

পরে প্রীতিলতার গলায় থাকা গামছা এবং পাশের কবুতরের খাবার রাখার বাক্স থেকে নেওয়া রশি ব্যবহার করে আগামীকে শ্বাসরোধ করা হয়। একইভাবে তাঁ মাকেও হত্যা করা হয় বলে জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।

এরপর বাড়িতে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা আছে কি না, সে বিষয়ে আশঙ্কা থেকে তারা নিচতলায় যান। সেখানে একটি পুরোনো প্লাস দিয়ে বিদ্যুতের তার কেটে দেন। পরে আবার ছাদে ফিরে মরদেহগুলো এমনভাবে সরিয়ে রাখেন, যাতে পাশের বাড়ির ছাদ থেকে সহজে দেখা না যায়।

শিশুটিকে ঘুম থেকে উঠতে দেখে হত্যা

এরপর তারা গণপতির ঘরে প্রবেশ করেন। সেখানে গিয়ে দেখতে পান, পরিবারের শিশুটি ঘুম থেকে উঠে গেছে। জবানবন্দি অনুযায়ী, শিশুটি সিদ্ধার্থকে চিনতে পেরে তাকে নাম ধরে ডাকে।

পুলিশ কমিশনার বলেন, তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুটি ঘুমন্ত ছিল বলে যে তথ্য পাওয়া গিয়েছিল, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তার ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। আসামিদের বক্তব্য অনুযায়ী, শিশুটি ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে চিনতে পেরেছিল।

শিশুটি চিৎকার করে অন্যদের জানিয়ে দিতে পারে—এই আশঙ্কায় তাকে কাপড় দিয়ে গলায় প্যাঁচ দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে।

ডাকাতির ঘটনা সাজানোর চেষ্টা

চারজনকে হত্যার পর আসামিরা কিছু সময় বিশ্রাম নেন ও গোসল করেন। পরে আরো একটি ইয়াবা সেবন করেন। এরপর হত্যাকাণ্ডকে চুরি বা ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখানোর পরিকল্পনা করেন তারা।

জবানবন্দি অনুযায়ী, ঘরের ড্রয়ার খুলে জিনিসপত্র এলোমেলো করা হয়। বিভিন্ন অলংকার সংগ্রহ করে প্লাস্টিকের বাক্স ও কাপড়ের প্যাকেটে রাখা হয়। বাড়ি থেকে ১৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়।

পরে জুমার নামাজের সময় বাইরে মানুষের চলাচল কমে গেলে তারা পাশের বাড়ির ছাদ হয়ে দেয়াল টপকে বেরিয়ে যান। স্বর্ণালংকারের একটি অংশ সিদ্ধার্থ একটি গলিতে নিয়ে মাটির নিচে পুঁতে রাখেন। পরে সেখান থেকে পুলিশ সেগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চালায় বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সিদ্ধার্থের ভাগে পাওয়া ৩ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে তিনি বন্ধক রাখা মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন। পরদিন তিনি স্বাভাবিকভাবে কাজে যোগ দেন। পরে পুলিশ মুগ্ধকে গ্রেফতার করে।

জবানবন্দিতে প্রায় একই তথ্য

মুগ্ধ দাসের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতেও হত্যাকাণ্ডের প্রায় একই বর্ণনা পাওয়া গেছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, রাত ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার দিকে ইয়াবা সেবনের জন্য তারা পাশের বাড়ির সীমানাপ্রাচীর টপকে প্রবেশ করেন এবং পরে সিদ্ধার্থের পরামর্শে গণপতি চক্রবর্তীর ছাদে যান।

মুগ্ধ জানান, সিদ্ধার্থ তাকে বলেছিলেন, এর আগেও তিনি ওই ছাদে এক-দুই দিন ইয়াবা সেবন করেছেন। ছাদে পানির ট্যাংকির আড়ালে বসে ইয়াবা সেবনের পর ভোর হয়ে যায়। এরপর গণপতি তাদের দেখে ফেললে হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হয়।

সাক্ষীর তথ্যও যাচাই করছে পুলিশ

পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সময় চিৎকারের শব্দ শুনেছিলেন—এমন একজন স্থানীয় নারী সাক্ষীর তথ্যও তদন্তে পাওয়া গেছে। তিনি পুলিশকে বিষয়টি জানানোর পর তার স্বামী তাকে মারধর করেছেন বলেও জানা গেছে।

পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, এ ধরনের চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কোনো ঘটনা দেখে বা শুনে থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে ময়নাতদন্ত, আসামিদের জবানবন্দি, ফরেনসিক তথ্য ও অন্যান্য আলামত পর্যালোচনা করে হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনা নিশ্চিত করার কাজ চলছে। ডিএনএ ও মাদকাসক্তি শনাক্তকরণ পরীক্ষার ফল তদন্তে নতুন কোনো তথ্য যোগ করে কি না, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এসি/আপ্র/২৭/০৮/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

এক ট্রলারে ৮০ মণ ইলিশ, বিক্রি ২০ লাখ টাকায়
২৭ আগস্ট ২০২৬

এক ট্রলারে ৮০ মণ ইলিশ, বিক্রি ২০ লাখ টাকায়

পটুয়াখালীর কুয়াকাটার আলীপুর-মহিপুর মৎস্য বন্দরে একটি মাছ ধরার ট্রলারে একসঙ্গে প্রায় ৮০ মণ ইলিশ ধরা প...

গাজীপুরে ঝুট গুদামে ভয়াবহ আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৫ ইউনিট
২৭ আগস্ট ২০২৬

গাজীপুরে ঝুট গুদামে ভয়াবহ আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৫ ইউনিট

গাজীপুরে একটি ঝুটের গোডাউনে ভয়াবহ আগুন লেগেছে। খবর পেয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিসের ৫ট...

মাদকাসক্ত ছেলেকে পুলিশে দিলেন বাবা-মা
২৭ আগস্ট ২০২৬

মাদকাসক্ত ছেলেকে পুলিশে দিলেন বাবা-মা

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে মাদক সেবনের অভিযোগে ছেলে রহিদুল ইসলামকে (২৫) পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন তার বাব...

রোগাক্রান্ত গরু গোপনে জবাই, মাংস বিক্রির চেষ্টায় আটক পাঁচ
২৭ আগস্ট ২০২৬

রোগাক্রান্ত গরু গোপনে জবাই, মাংস বিক্রির চেষ্টায় আটক পাঁচ

সাতক্ষীরায় মারাত্মক রোগাক্রান্ত ও পোকাধরা গরু গোপনে জবাই করে সুস্থ গরুর মাংস হিসেবে সাধারণ মানুষের ক...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান ঠেকাতে রোডম্যাপ চান আইনমন্ত্রী

ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান রোধ এবং ভবিষ্যতে কেউ যাতে ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে না পারে, সে লক্ষ্যে একটি রোডম্যাপ তৈরিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। বুধবার (২৬ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মন্ত্রীর চাওয়ার সাথে একমত?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 14 ঘন্টা আগে