নিয়মিত শারীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর খাবার আর নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন—হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে এসবের গুরুত্ব অনেক। কিন্তু এসব মেনে চলার পরও একটি সাধারণ ভুল নীরবে হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে। আর সেই ভুলটি হলো পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া।
সকালে হাঁটাহাঁটি থেকে শুরু করে খাবারে তেল-মশলা কমানো—সবই করছেন, কিন্তু রাতে ঠিকমতো ঘুম হচ্ছে না। চিকিৎসকদের মতে, দিনের অন্য সব স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ও ভালো ঘুমও হৃদযন্ত্রের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
দিল্লির একটি বেসরকারি হাসপাতালের হৃদ্রোগ চিকিৎসক অংশুল কুমার জৈন এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে প্রতি রাতেই নীরবে হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
রাতে ঘুমানোর সময় শরীর বিশ্রাম নেয়, একই সঙ্গে বিশ্রাম পায় হৃদযন্ত্রও। সাধারণত ঘুমের সময় রক্তচাপ ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। এতে রক্তনালিগুলো কিছুটা শিথিল হয় এবং হৃদযন্ত্রও প্রয়োজনীয় বিশ্রামের সুযোগ পায়।
কিন্তু ঘুম ঠিকমতো না হলে বা বারবার ভেঙে গেলে রক্তচাপ স্বাভাবিকভাবে কমার এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। হৃদস্পন্দনও যতটা কমার কথা, ততটা কমে না। ফলে হৃদযন্ত্র প্রয়োজনীয় বিশ্রাম পায় না।
রাতের পর রাত এমন চলতে থাকলে ধীরে ধীরে হৃদযন্ত্রের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শুধু ক্লান্তিই আসে না, শরীরেও নানা পরিবর্তন ঘটে। নিয়মিত কম ঘুমের কারণে কর্টিসল ও অ্যাড্রিনালিনের মতো মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত হরমোনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
এসব হরমোনের অতিরিক্ত প্রভাব হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। ফলে দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি থাকলে হৃদযন্ত্রের জন্য ঝুঁকি বাড়তে পারে।
রক্তনালিতে হতে পারে প্রদাহ
দিনের পর দিন ঠিকমতো ঘুম না হলে শরীরে প্রদাহ তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিনের এই প্রদাহ রক্তনালির ক্ষতি করতে পারে।
এর সঙ্গে রক্তচাপ ঠিক না থাকা এবং রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হলে ধমনিতে চর্বির আস্তরণ বা প্লাক জমার ঝুঁকি বাড়ে। এতে ধমনি সরু হয়ে যেতে পারে। পরবর্তী সময়ে এর কারণে হৃদ্যন্ত্রে রক্ত চলাচলে সমস্যা তৈরি হয়ে হৃদরোগ বা হৃদযন্ত্রের আকস্মিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
প্রভাব পড়ে রক্তে শর্করাতেও
ঘুমের ঘাটতি শরীরের বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ইনসুলিন হরমোন ঠিকমতো কাজ করতে না পারায় রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে পারে।
দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে ইনসুলিনের প্রতি শরীরের সংবেদনশীলতা কমে গিয়ে দ্বিতীয় ধরনের ডায়াবিটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। আর ডায়াবিটিস হৃদযন্ত্রের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি।
এছাড়া ঘুমের ঘাটতিতে হজমের সমস্যা ও হরমোনের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে, যা পরোক্ষভাবে হৃদযন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
শুধু ব্যায়াম আর খাবারই যথেষ্ট নয়
হৃদযন্ত্র ভালো রাখতে স্বাস্থ্যকর খাবার ও নিয়মিত শারীরচর্চার পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুমকেও গুরুত্ব দিতে হবে। চিকিৎসকের মতে, টানা ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম শরীরকে বিশ্রাম দেওয়ার পাশাপাশি হৃদযন্ত্রের জন্যও উপকারী।
অন্যদিকে, নিয়মিত ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা ঘুমানো কিংবা বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়ার মতো সমস্যা থাকলে তা অবহেলা করা ঠিক নয়। কারণ ঘুমের এই ঘাটতি বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও দীর্ঘদিন ধরে হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
এসি/আপ্র/২৭/০৮/২০২৬