ওজন কমানো ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ক্ষেত্রে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বা অন্তর্বর্তী উপবাস এখন বেশ জনপ্রিয়। দিনের নির্দিষ্ট একটি সময়ের মধ্যে খাবার খাওয়া এবং বাকি সময় উপবাসে থাকা, কিংবা সপ্তাহের নির্দিষ্ট কয়েক দিন খাবারের পরিমাণ অনেকটা কমিয়ে দেওয়া—এই পদ্ধতির বিভিন্ন ধরন রয়েছে।
অনেকে মনে করেন, প্রচলিত ক্যালরি কমানোর চেয়ে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বেশি কার্যকর। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ পদ্ধতিকে ক্যানসার প্রতিরোধ, স্মৃতিশক্তি ভালো রাখা, দীর্ঘায়ু ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতির মতো নানা সুবিধার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কিন্তু মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণার ফলাফল এতটা সরল নয়।
গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং ওজন কমাতে কার্যকর হতে পারে। তবে সাধারণ ক্যালরি কমানোর তুলনায় এটি সবসময় বেশি কার্যকর—এমন শক্ত প্রমাণ নেই। ১২ মাসের একটি নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার খাওয়া ও প্রতিদিন ক্যালরি কমানোর মধ্যে ওজন কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি। তবে ২০২৫ সালে প্রকাশিত আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় সপ্তাহে তিন দিন উল্লেখযোগ্যভাবে ক্যালরি কমানোর একটি নির্দিষ্ট ধরনের অন্তর্বর্তী উপবাস সাধারণ দৈনিক ক্যালরি কমানোর তুলনায় সামান্য বেশি ওজন কমাতে পেরেছে। ফলে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের কার্যকারিতা নির্ভর করে কোন পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে এবং তা কতটা নিয়মিতভাবে বজায় রাখা যাচ্ছে, তার ওপরও।
উপবাসে শরীরে কী ঘটে
উপবাসের সময় খাবার থেকে নতুন শক্তি না পাওয়ায় শরীর ধীরে ধীরে সঞ্চিত শক্তি ব্যবহারের দিকে যায়। দীর্ঘ সময় না খেলে শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তন ঘটে এবং সঞ্চিত চর্বি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে পারে।
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নিয়ে আগ্রহের একটি বড় কারণ হলো অটোফ্যাজি নামের একটি কোষীয় প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় কোষের ক্ষতিগ্রস্ত বা অপ্রয়োজনীয় উপাদান ভেঙে পুনর্ব্যবহার করা হয়। প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় উপবাসের সঙ্গে অটোফ্যাজি ও বিভিন্ন বিপাকীয় পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এসব ফলাফল মানুষের ক্ষেত্রে একই মাত্রায় ঘটে এবং এর ফলে ক্যানসার বা স্মৃতিশক্তি হ্রাসের মতো রোগ প্রতিরোধ হয়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই।
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নিয়ে মানুষের গবেষণায় সবচেয়ে ধারাবাহিকভাবে যে সুবিধাটি দেখা যায়, তা হলো ওজন কমানো। তবে ওজন কমার বড় একটি কারণ সম্ভবত উপবাসের সময় কম খাবার খাওয়ার ফলে মোট ক্যালরি গ্রহণ কমে যাওয়া।
মানুষের ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর
ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় শিকাগোর পুষ্টিবিজ্ঞানী ক্রিস্টা ভারাডির নেতৃত্বে পরিচালিত ১২ মাসের একটি গবেষণায় স্থূলতায় আক্রান্ত ৯০ জন প্রাপ্তবয়স্ককে তিনটি দলে ভাগ করা হয়। একটি দল প্রতিদিন আট ঘণ্টার মধ্যে খাবার খেয়েছে, অন্য দল প্রতিদিন প্রায় ২৫ শতাংশ ক্যালরি কমিয়েছে এবং তৃতীয় দল স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস বজায় রেখেছে। এক বছর পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার খাওয়া দলের গড় ওজন কমেছে প্রায় ৪ দশমিক ৬ কেজি। প্রতিদিন ক্যালরি কমানো দলের ওজন কমেছে প্রায় ৫ দশমিক ৪ কেজি। তবে দুই পদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল না। আরও সাম্প্রতিক ১২ সপ্তাহের একটি নিয়ন্ত্রিত গবেষণাতেও আট ঘণ্টার নির্দিষ্ট খাবারের সময়সীমা সাধারণ খাদ্যাভ্যাস বা ক্যালরি কমানোর তুলনায় ওজন, শরীরের গঠন ও রক্তে শর্করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত সুবিধা দেখাতে পারেনি।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ১২ মাসের একটি গবেষণায় সপ্তাহে তিন দিন খাবারের শক্তি গ্রহণ ব্যাপকভাবে কমানো ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং পদ্ধতিতে প্রতিদিন ক্যালরি কমানোর তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৯ কেজি বেশি ওজন কমেছে। তবে গবেষণাটিতে অংশগ্রহণকারীদের নিবিড় আচরণগত সহায়তা দেওয়া হয়েছিল এবং ফলাফল সব মানুষের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য কি না, তা নিশ্চিত নয়।
ইঁদুরের গবেষণার ফল মানুষের ক্ষেত্রে কতটা প্রযোজ্য
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নিয়ে অনেক আকর্ষণীয় দাবি প্রাণীর গবেষণা থেকে এসেছে। ইঁদুরের ওপর পরিচালিত গবেষণায় উপবাসের সঙ্গে বিপাকীয় পরিবর্তন, অটোফ্যাজি, হৃদ্স্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ুর মতো বিভিন্ন সম্ভাব্য সুবিধার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কিন্তু প্রাণী ও মানুষের বিপাক এক নয়। গবেষণায় ব্যবহৃত ইঁদুরের খাদ্যাভ্যাস, জেনেটিক বৈশিষ্ট্য ও জীবনযাপনও মানুষের তুলনায় অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত থাকে। ফলে ইঁদুরের ওপর কোনো উপকার দেখা গেলেই তা মানুষের ক্ষেত্রে একইভাবে ঘটবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
মানুষের গবেষণায় খাবারের পরিমাণ ও ধরন সঠিকভাবে হিসাব করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা অনেক সময় কী খেয়েছেন বা কতটা খেয়েছেন, তা সঠিকভাবে মনে রাখতে পারেন না। ফলে খাদ্য গ্রহণের তথ্যের ওপর নির্ভরশীল গবেষণার ফলেও কিছু অনিশ্চয়তা থেকে যায়।
ক্যালরি কমে যাওয়াই কি মূল কারণ
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের একটি বড় সুবিধা হলো এটি অনেকের জন্য ক্যালরি হিসাব না করেও খাবারের পরিমাণ কমানোর সহজ উপায় হতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে খাবার না খাওয়ার কারণে কেউ কেউ স্বাভাবিকভাবেই দিনে কম ক্যালরি গ্রহণ করেন।
২০২৩ সালে প্রকাশিত ১২ মাসের একটি গবেষণায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার খাওয়া দলের দৈনিক শক্তি গ্রহণ প্রায় ৪২৫ ক্যালরি কমেছিল। প্রতিদিন ক্যালরি কমানো দলের ক্ষেত্রেও কমেছিল প্রায় ৪০৫ ক্যালরি। দুই পদ্ধতিতেই ওজন কমেছিল, কিন্তু একটির সঙ্গে অন্যটির উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
এমনকি ২০২৪ সালের একটি নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় দুই দলের খাবারের মোট ক্যালরি সমান রাখা হয়েছিল। সেখানে ১২ সপ্তাহ পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার খাওয়া দলের ওজন কমার পরিমাণ ছিল প্রায় ২ দশমিক ৩ কেজি, আর স্বাভাবিক সময়জুড়ে খাবার খাওয়া দলের কমেছিল প্রায় ২ দশমিক ৬ কেজি। রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের সূচকেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়নি। এতে ইঙ্গিত মেলে, শুধু খাবারের সময় সীমিত করাই ওজন কমানোর জন্য আলাদা কোনো জাদুকরী প্রক্রিয়া তৈরি করে—এমনটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে মোট ক্যালরি গ্রহণ কমে যাওয়াই ওজন কমার প্রধান কারণ হতে পারে।
তাহলে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কি করা যাবে
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংকে পুরোপুরি অকার্যকর বলারও সুযোগ নেই। অনেক মানুষের জন্য এটি খাবারের সময় ও পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের একটি সহজ কাঠামো তৈরি করতে পারে এবং এর মাধ্যমে ওজন কমানো সম্ভব। তবে এটি অন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের তুলনায় সবার জন্য বেশি কার্যকর—এমন প্রমাণ নেই। কোনো ব্যক্তির জন্য এই পদ্ধতি সুবিধাজনক হতে পারে, আবার অন্য কারও জন্য নিয়মিত ও পরিমিত খাবার খাওয়াই বেশি টেকসই হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় উপবাসের ক্ষেত্রে বয়স, শারীরিক অবস্থা, ওষুধের ব্যবহার এবং ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত বিষয় বিবেচনা করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং করলেও খাবারের সময়সীমার মধ্যে অতিরিক্ত মিষ্টি, পরিশোধিত শর্করা, অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার বা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ক্যালরি গ্রহণ করলে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও পাওয়া যেতে পারে।
তাই ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংকে কোনো অলৌকিক স্বাস্থ্যপদ্ধতি হিসেবে না দেখে ওজন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য একটি খাদ্যাভ্যাস হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসংগত। বর্তমান গবেষণা বলছে, এটি ওজন কমাতে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু প্রচলিত ক্যালরি কমানোর চেয়ে নিশ্চিতভাবে বেশি কার্যকর—এমন সিদ্ধান্ত এখনো দেওয়া যায় না। আর প্রাণীর গবেষণায় পাওয়া দীর্ঘায়ু, ক্যানসার প্রতিরোধ বা স্মৃতিশক্তি সংরক্ষণের মতো চমকপ্রদ দাবিগুলো মানুষের ক্ষেত্রে নিশ্চিত করতে আরও দীর্ঘমেয়াদি ও শক্তিশালী গবেষণা প্রয়োজন।
সূত্র: বিবিসি
wWwm/AvcÖ/25/08/2026