রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে শুরু করলে অনেকেই দ্রুত কোনো পাউডার, ট্যাবলেট বা প্রাকৃতিক উপাদানের ওপর ভরসা করতে চান। কিন্তু রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কোনো একটি ‘জাদুকরী’ পুষ্টি উপাদান নির্ভরযোগ্য সমাধান নয়।
খাবারের ধরন, পরিমাণ, শর্করার উৎস, হজম ও শোষণের গতি, ইনসুলিনের কার্যকারিতা এবং শারীরিক সক্রিয়তা সবকিছু মিলেই রক্তে গ্লুকোজের মাত্রাকে প্রভাবিত করে। তাই সুষম খাদ্যাভ্যাস ও চিকিৎসকের পরামর্শে ডায়াবেটিসের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি পুষ্টি উপাদানের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে।
প্রোটিন খাবারের পর শর্করা বাড়ার গতি প্রভাবিত করতে পারে
প্রোটিন শুধু পেশি গঠনের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, খাবারের পর রক্তে শর্করার প্রতিক্রিয়াতেও এর প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে শর্করাযুক্ত খাবারের সঙ্গে বা আগে প্রোটিন গ্রহণ করলে কিছু ক্ষেত্রে পাকস্থলী খালি হওয়ার গতি কমতে পারে এবং ইনসুলিন ও অন্ত্রের কিছু হরমোনের নিঃসরণ বাড়তে পারে। ফলে খাবারের পর রক্তে শর্করা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে।
নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসে থাকা দ্বিতীয় ধরনের ডায়াবেটিসের রোগীদের নিয়ে একটি গবেষণায় খাবারের আগে বা সঙ্গে দুধের প্রোটিন গ্রহণে খাবারের পর রক্তে শর্করার বৃদ্ধি কমে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে প্রোটিনকে সরাসরি রক্তে শর্করা কমানোর উপাদান হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বিশেষ করে প্রথম ধরনের ডায়াবেটিসে বেশি পরিমাণ প্রোটিন গ্রহণের পর রক্তে শর্করা বাড়তেও পারে।
তাই ডায়াবেটিস থাকলে নিজের ইচ্ছায় অতিরিক্ত প্রোটিন খাওয়া বা ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করা উচিত নয়। ডিম, মাছ, মুরগি, দুধ, পনির ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎস সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে।
আঁশ গ্লুকোজ শোষণের গতি কমাতে পারে
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত আঁশ রাখা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দ্রবণীয় আঁশ হজমের সময় খাবারের সঙ্গে জেলজাতীয় আবরণ তৈরি করে গ্লুকোজ শোষণের গতি ধীর করতে পারে। ফলে খাবারের পর রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়ার প্রবণতা কমতে পারে।
শাকসবজি, ডাল, পূর্ণ শস্য, বাদাম, বীজ ও গোটা ফল আঁশের ভালো উৎস।
বেরি, কিউই বা অ্যাভোকাডোর মতো ফল থেকেও আঁশ পাওয়া যায়। তবে শুধু কোনো একটি ফল বা সবজিকে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের বিশেষ উপায় হিসেবে না দেখে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসে বেশি আঁশযুক্ত ও কম প্রক্রিয়াজাত খাবার রাখাই গুরুত্বপূর্ণ। খাবারের মোট শর্করার পরিমাণ ও ধরনও রক্তে শর্করার ওপর বড় প্রভাব ফেলে। আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনের গবেষণা-ভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, খাবারের পর রক্তে শর্করার ওপর সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা; তবে খাদ্যের চর্বি ও প্রোটিনও এ প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
স্বাস্থ্যকর চর্বি বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
তৈলাক্ত মাছ, আখরোট, বিভিন্ন বীজসহ কিছু খাবারে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়। এসব স্বাস্থ্যকর চর্বি সরাসরি রক্তে শর্করা কমানোর ওষুধের বিকল্প নয়। তবে সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে এগুলো হৃদ্স্বাস্থ্য ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—চর্বি খাবারের পর রক্তে শর্করার প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে এবং কখনো কখনো পাকস্থলী খালি হওয়ার গতি কমিয়ে রক্তে শর্করা বাড়ার সময় পিছিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে প্রথম ধরনের ডায়াবেটিসে বেশি চর্বি ও প্রোটিনযুক্ত খাবারের পর দীর্ঘ সময় ধরে রক্তে শর্করা বাড়তে পারে। তাই ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবার উপকারী হলেও এটিকে রক্তে শর্করা কমানোর সরাসরি উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
ম্যাগনেসিয়াম গ্লুকোজ বিপাকে ভূমিকা রাখে
শরীরের বহু জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ম্যাগনেসিয়াম প্রয়োজন। জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের খাদ্য-পরিপূরকবিষয়ক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণসহ শরীরের বিভিন্ন বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় ম্যাগনেসিয়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
খাদ্য থেকে বেশি ম্যাগনেসিয়াম গ্রহণের সঙ্গে দ্বিতীয় ধরনের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে। তবে এ ধরনের গবেষণা মূলত সম্পর্ক নির্দেশ করে; অর্থাৎ বেশি ম্যাগনেসিয়াম গ্রহণ করলেই ডায়াবেটিস প্রতিরোধ হবে এমন নিশ্চয়তা দেয় না। শাকসবজি, ডাল, বাদাম, বীজ ও পূর্ণ শস্য ম্যাগনেসিয়ামের ভালো উৎস। তবে ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি নির্ণয় না করেই সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ শুরু করা উচিত নয়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ম্যাগনেসিয়াম সাপ্লিমেন্ট নিয়মিত ব্যবহারের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ এখনো নেই বলে জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্যেও উল্লেখ করা হয়েছে।
আয়রন ও এইচবিএ১সি পরীক্ষায় সতর্কতা জরুরি
আয়রন রক্তে শর্করা কমানোর কোনো পুষ্টি উপাদান নয়। তবে রক্তে আয়রনের ঘাটতি ও আয়রন-ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ফলকে প্রভাবিত করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, আয়রনের ঘাটতি বা আয়রন-ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা থাকলে এইচবিএ১সি মাত্রা প্রকৃত রক্তে শর্করার তুলনায় বেশি দেখাতে পারে।
অর্থাৎ গ্লুকোজের মাত্রা একই রকম থাকলেও পরীক্ষার ফল দেখে নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাশার চেয়ে খারাপ মনে হতে পারে। তবে এ কারণে নিজের ইচ্ছায় আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করে এইচবিএ১সি কমানোর চেষ্টা করা উচিত নয়। অতিরিক্ত আয়রনও শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। আয়রনের ঘাটতি আছে কি না, তা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা উচিত।
একটি পুষ্টি উপাদানের ওপর নির্ভর নয়
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে কোনো একক খাবার বা পুষ্টি উপাদানকে ‘জাদুকরী সমাধান’ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বরং শাকসবজি, আঁশযুক্ত খাবার, স্বাস্থ্যকর প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি, পূর্ণ শস্য ও প্রয়োজনীয় খনিজসমৃদ্ধ একটি সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে পরিশোধিত শর্করা ও অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার কমানো, খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ—এসব একসঙ্গে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারও রক্তে শর্করা নিয়মিত বেশি থাকলে শুধু খাবার বা পুষ্টি উপাদানের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। একইভাবে কোনো পুষ্টি-পরিপূরক শুরু বা বন্ধ করার আগে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
ডিসি/আপ্র/২৫/০৮/২০২৬