‘চির-বিদ্রোহী’ কণ্ঠের সেই কবি আজও যেন সময়ের বুক চিরে উচ্চারণ করে চলেছেন মানুষের মুক্তির গান। দ্রোহ, সাম্য, প্রেম, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার যে দীপ্ত শিখা কাজী নজরুল ইসলাম জ্বেলে গিয়েছিলেন, অর্ধশতাব্দী পরও তা নিভে যায়নি। আজ বৃহস্পতিবার (১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ২৭ আগস্ট) জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী। যথাযোগ্য মর্যাদা ও নানা আয়োজনে স্মরণ করা হচ্ছে বাংলা সাহিত্যের এই অমর কবিকে।
শরীরের মৃত্যু তাঁকে থামিয়ে দিয়েছে, কিন্তু থামাতে পারেনি তাঁর কবিতার বিদ্রোহ, গানের সুর কিংবা মানুষের প্রতি তাঁর অকুণ্ঠ ভালোবাসা। অন্যায়-অবিচার, শোষণ-বঞ্চনা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তাঁর যে উচ্চারণ, তা আজও সময়ের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়। প্রেম ও সাম্যের যে স্বপ্ন তিনি এঁকেছিলেন, তা আজও নতুন প্রজন্মের কল্পনায় আলো জ্বালে।
সমাধির পাশে শ্রদ্ধার অর্ঘ্য
জাতীয় কবির সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক গভীর ও ঐতিহাসিক। জীবনের শেষ অধ্যায় পেরিয়ে তাঁর চিরনিদ্রার ঠিকানাও হয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে। তাই প্রতিবছরের মতো এবারও তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েছে নানা কর্মসূচি।
সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ মসজিদুল জামিয়ায় বাদ ফজর অনুষ্ঠিত হবে কোরআনখানি। সকাল সাড়ে ৬টায় উপাচার্যের নেতৃত্বে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে সমবেত হবেন। সকাল ৬টা ৪৫ মিনিটে সেখান থেকে শোভাযাত্রা নিয়ে তাঁরা যাবেন কবির সমাধিতে। সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ, ফাতেহা পাঠ ও শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হবে তাঁকে।
এরপর সমাধি প্রাঙ্গণের উন্মুক্ত মঞ্চে উপাচার্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা। এতে স্মারক বক্তৃতা করবেন নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক ড. তারিক মনজুর। সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য শিক্ষা অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, উপ-উপাচার্য প্রশাসন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বক্তব্য দেবেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করবেন বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ সালেকীন)।
মৃত্যুঞ্জয়ী নজরুল’ স্মরণে নজরুল ইনস্টিটিউট
কবির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে নজরুল ইনস্টিটিউটেও থাকছে বিশেষ আয়োজন। ‘মৃত্যুঞ্জয়ী নজরুল’ শীর্ষক আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল ও হামদ-নাতের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতি সচিব কানিজ মওলা। কবির জীবন, সাহিত্য, দর্শন ও মানবিক চেতনার নানা দিক উঠে আসবে এ আয়োজনে।
এ ছাড়া বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, নজরুল একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও কবিকে স্মরণে নানা কর্মসূচি নিয়েছে। কোথাও আলোচনা, কোথাও কবিতা আবৃত্তি; কোথাও আবার নজরুলসংগীতের সুরে স্মরণ করা হবে তাঁকে। গণমাধ্যমেও প্রচারিত হবে কবির জীবন ও সৃষ্টিকর্ম নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান।
বিদ্রোহের আগুনে মানবতার আলো
নজরুলের কবিতায় বিদ্রোহ যেমন আছে, তেমনি আছে মমতার কোমল আলো। তিনি শোষিত মানুষের কণ্ঠে ভাষা দিয়েছেন, নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর কবিতায় সাম্যের ডাক, গানে প্রেমের আকুতি, প্রবন্ধে সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে তীক্ষ্ণ প্রশ্ন—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য বহুমাত্রিক প্রতিভা।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিল নির্ভীক। ‘বিদ্রোহী’সহ তাঁর অসংখ্য কবিতা ও গান মানুষের মধ্যে প্রতিবাদ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জাগিয়েছিল। তাঁর লেখায় ধর্মীয় সংকীর্ণতার স্থান ছিল না; বরং হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতি, মানুষের মর্যাদা এবং সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ছিল প্রবল।
কবিতা, গান, প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস ও নাটক—সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় তিনি রেখে গেছেন উজ্জ্বল স্বাক্ষর। তাঁর অসংখ্য গান বাংলা সংগীতভান্ডারকে করেছে সমৃদ্ধ। তাই নজরুল কেবল একটি সময়ের কবি নন; তিনি বহমান সময়ের কবি।
বাংলাদেশের মাটিতে শেষ ঠিকানা
১৯৭২ সালের ২৪ মে সপরিবারে কলকাতা থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে আসেন কাজী নজরুল ইসলাম। স্বাধীন বাংলাদেশ তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি প্রদান করে। ১৯৭৬ সালে তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয় এবং একই বছর তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন।
জীবনের শেষ দিকে দীর্ঘ অসুস্থতায় নীরব হয়ে গিয়েছিল তাঁর কণ্ঠ। কিন্তু তাঁর সৃষ্টির কণ্ঠ কখনো নীরব হয়নি।
এখানে একটি তারিখগত বিষয়ও উল্লেখযোগ্য। কাজী নজরুল ইসলাম ইংরেজি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট, বাংলা ১২ ভাদ্র ১৩৮৩, ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। বাংলাদেশে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী বাংলা তারিখ ১২ ভাদ্র অনুযায়ী পালিত হয়। এ বছর ১২ ভাদ্র পড়েছে ২৭ আগস্ট। ফলে আজই দেশে পালিত হচ্ছে জাতীয় কবির ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে এখনো শুয়ে আছেন সেই কবি—যিনি লিখেছিলেন বিদ্রোহের আগুনে, গেয়েছেন মানুষের মুক্তির গান। পাঁচ দশক পেরিয়ে তাঁর শরীর মাটির নিচে, কিন্তু তাঁর শব্দ এখনো মানুষের কণ্ঠে। অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার যে সাহস তিনি শিখিয়েছেন, সাম্যের যে স্বপ্ন দেখিয়েছেন, মানবতার যে পতাকা তুলে ধরেছেন—সেটিই তাঁকে করে রেখেছে সত্যিকার অর্থে ‘মৃত্যুঞ্জয়ী’।
নজরুলের মৃত্যু হয়েছে; কিন্তু নজরুলের চেতনার মৃত্যু হয়নি। বরং যতদিন মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, যতদিন বৈষম্যের বিরুদ্ধে উচ্চারিত হবে সাম্যের দাবি, যতদিন মানুষ মানুষকে ভালোবাসার ভাষা খুঁজবে—ততদিন নতুন করে ফিরে আসবেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
সানা/আপ্র/২৭/৮/২০২৬