গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

হিমালয়ের প্রলয় থেকে বাংলাদেশকে কঠিন সতর্কবার্তা

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১২:৫৬ পিএম, ২৯ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ২১:৪৫ এএম ২০২৬
হিমালয়ের প্রলয় থেকে বাংলাদেশকে কঠিন সতর্কবার্তা
ছবি

ফাইল ছবি

হিমালয়ের বুক চিরে নেমে আসা এক প্রলয়ংকরী জলধারা আবারো প্রমাণ করল, পাহাড়ের বিপর্যয় কখনো শুধু পাহাড়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ও পাহাড়ি ঢালের বিশাল অংশ ধসে নদীর গতিপথ আটকে যাওয়ার পর সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় ২৮ আগস্ট বিকেল পর্যন্ত নেপালে ৪৮২ জনের মৃত্যু এবং প্রায় ৯০০ জনের নিখোঁজ হওয়ার খবর এসেছে। তিব্বতেও প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সীমান্ত অবকাঠামো ও জনবসতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিপর্যয়ের পর নতুন করে বাধাহ্রদ উপচে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এ শুধু নেপালের দুর্যোগ নয়; হিমালয় অববাহিকার ঝুঁকি কতটা দ্রুত ও অনিশ্চিতভাবে রূপ বদলাতে পারে, তার ভয়াবহ দৃষ্টান্ত।

বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ বলছে, ঘটনার তাৎক্ষণিক কারণ ছিল হিমবাহ বা পাহাড়ি ঢালের বরফ-পাথর-মাটির বিপুল ধস, যার ফলে নদীর প্রবাহ সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। পরে জমে থাকা পানির চাপ সেই প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে দিলে সৃষ্টি হয় আকস্মিক প্রবল পানিপ্রবাহ। অর্থাৎ বিপর্যয়ের সূত্রপাত শুধু বৃষ্টিতে নয়; পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক অস্থিতিশীলতা, হিমবাহের পরিবর্তন এবং নদীর গতিপথের আকস্মিক পরিবর্তন একে ভয়াবহ করে তুলেছে।

এখানেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক উষ্ণতার ফলে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে, উচ্চপর্বতের বরফ ও হিমায়িত মাটি দুর্বল হচ্ছে এবং নতুন নতুন হিমবাহ হ্রদ তৈরি হচ্ছে। হিন্দুকুশ-হিমালয়ে দুই হাজার সালের পর হিমবাহ গলার হার প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার তথ্য উদ্বেগজনক। তবে কোনো নির্দিষ্ট বন্যাকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের একক ফল বলা বিজ্ঞানসম্মত নয়। বরং জলবায়ু পরিবর্তন এমন একটি ভূপ্রকৃতিকে আরো অস্থিতিশীল করে তুলছে, যেখানে সামান্য প্রাকৃতিক পরিবর্তনও বড় বিপর্যয়ের অনুঘটক হতে পারে।

আরেকটি কঠিন শিক্ষা হলো-ঝুঁকির তালিকা তৈরি করলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। কোশি, গণ্ডকী ও কর্ণালী অববাহিকায় তিন হাজার ছয় শতাধিক হিমবাহ হ্রদ শনাক্ত হলেও নতুন হ্রদ তৈরি হতে পারে, পুরোনো হ্রদের আয়তন দ্রুত বদলাতে পারে। ফলে প্রয়োজন স্থির তালিকা নয়, ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ, উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ, স্বয়ংক্রিয় পরিমাপ এবং তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নেপালের মতো হিমবাহজনিত বন্যার আশঙ্কা নেই-এ কথা স্পষ্টভাবে স্বীকার করেই আমাদের নিজেদের ঝুঁকির দিকে তাকাতে হবে। ভূমিকম্প, পাহাড়ধস, অতিবৃষ্টি, জলাধারের নিরাপত্তা ও আকস্মিক পানিপ্রবাহের সমন্বিত ঝুঁকি কিন্তু বাস্তব। বিশেষত কাপ্তাই বাঁধের মতো পুরোনো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ভূমিকম্প সহনশীলতা নিয়ে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। কাঠামোগত সক্ষমতা, পানির চাপ, সম্ভাব্য দুর্বলতা এবং বড় ভূমিকম্পে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে নিম্নাঞ্চলে পানির সম্ভাব্য প্রবাহ-এসবের স্বাধীন ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন জরুরি।

একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও দেশের অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে ভূতাত্ত্বিক নজরদারি, ভূমিধস পর্যবেক্ষণ, জলাধার নিরাপত্তা নিরীক্ষা এবং দুর্যোগের সম্ভাব্য প্রবাহপথের ঝুঁকিচিত্র তৈরি করতে হবে। সতর্কবার্তা পৌঁছাতে হবে শুধু প্রশাসনের কাছে নয়, ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের মুঠোফোন ও স্থানীয় নেতৃত্বের কাছেও। প্রয়োজনে সরিয়ে নেওয়ার মহড়াও নিয়মিত করতে হবে।

সবচেয়ে জরুরি, হিমালয় ও আন্তঃসীমান্ত নদী অববাহিকার দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় জোরদার করা। উজানের হিমবাহ, বৃষ্টিপাত, ভূমিধস, নদীর প্রবাহ ও জলাধারের পরিবর্তনের তথ্য সময়মতো না পেলে ভাটির দেশের প্রস্তুতির সময় থাকে না।

স্পষ্টত, নেপালের এই বিপর্যয় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ দুর্যোগের ভবিষ্যদ্বাণী নয়; কিন্তু এটি অবহেলার বিরুদ্ধে নির্মম সতর্কবার্তা। প্রকৃতির শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, কিন্তু বিজ্ঞান, তথ্য, প্রযুক্তি আর সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি দিয়ে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি বহুলাংশে কমানো সম্ভব। দুর্যোগ আঘাত হানার পর রাষ্ট্রের তৎপরতা নয়-দুর্যোগের আগেই রাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত, শেষ বিচারে তার ওপরই নির্ভর করবে মানুষের নিরাপত্তা। হিমালয়ের প্রলয়ের এই শিক্ষা তাই এখনই গ্রহণ করতে হবে।
সানা/আপ্র/২৯/৮/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

নির্ধারিত দামে এলপিজি নিশ্চিত করুন, ভোক্তাকে জিম্মি করা বন্ধ হোক
১৪ অক্টোবর ২০২৬

নির্ধারিত দামে এলপিজি নিশ্চিত করুন, ভোক্তাকে জিম্মি করা বন্ধ হোক

জ্বালানি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য উপকরণ। অথচ সরকার নির্ধারিত দামেও যদি রান্নার গ্যাস না মেল...

প্রবাসীর প্রাণ, আঞ্চলিক শান্তি ও মানবিক নিরাপত্তার কঠিন পরীক্ষা
১৩ অক্টোবর ২০২৬

প্রবাসীর প্রাণ, আঞ্চলিক শান্তি ও মানবিক নিরাপত্তার কঠিন পরীক্ষা

প্রবাসে উপার্জিত অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে, অসংখ্য পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখে। অথচ সেই উপার্জ...

রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি, অসহিষ্ণুতার অশনিসংকেত
১২ অক্টোবর ২০২৬

রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি, অসহিষ্ণুতার অশনিসংকেত

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি...

বন্দরের নিয়ন্ত্রণে জাতীয় স্বার্থ, চুক্তিতে চাই পূর্ণ স্বচ্ছতা
১০ অক্টোবর ২০২৬

বন্দরের নিয়ন্ত্রণে জাতীয় স্বার্থ, চুক্তিতে চাই পূর্ণ স্বচ্ছতা

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পরিচয় যা-ই হোক, চাঁদাবাজ-দখলদারদের ছাড় নয়: ডিএমপি কমিশনার

চাঁদাবাজ, ভূমি দখলবাজ ও মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় বা অবস্থান বিবেচনা না করে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ। এসব অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানো যাবে না বলেও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে ডিএমপি সদর দপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সেপ্টেম্বর মাসের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় উপস্থিত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এসব নির্দেশনা দেন কমিশনার। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন- কমিশনার যে নির্দেশনা দিয়েছেন, পুলিশ সদস্যরা তা বাস্তবে তা করতে পারবেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 22 ঘন্টা আগে