গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

ছিনতাইয়ের হ্যাঁচকায় বিপন্ন রাজধানীর নাগরিক জীবন, জননিরাপত্তার দায় কার?

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৭:৩১ পিএম, ৩১ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ২২:২৩ এএম ২০২৬
ছিনতাইয়ের হ্যাঁচকায় বিপন্ন রাজধানীর নাগরিক জীবন, জননিরাপত্তার দায় কার?
ছবি

জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার কাছে ভোরে চলন্ত রিকশা থেকে ব্যাগের হ্যাঁচকা টানে প্রধান শিক্ষিকা রনজিনা পারভীনের পড়ে গিয়ে মৃত্যু বাস্তবতাকে নির্মমভাবে সামনে এনেছে -ফাইল ছবি

রাজধানীর রাস্তায় এখন ছিনতাই কেবল মানুষের অর্থ-সম্পদ কেড়ে নেওয়ার অপরাধ নয়; এটি নাগরিকের জীবন ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-ব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার কাছে ভোরে চলন্ত রিকশা থেকে ব্যাগের হ্যাঁচকা টানে প্রধান শিক্ষিকা রনজিনা পারভীনের পড়ে গিয়ে মৃত্যু সেই বাস্তবতাকে নির্মমভাবে সামনে এনেছে। চিকিৎসার জন্য স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় আসা একজন শিক্ষক যদি রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকার সড়কেও নিরাপদে চলতে না পারেন, তবে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

আরো ভয়াবহ হলো, ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন বিচ্যুতি নয়। একই ভোরে কদমতলীতে পথচারী ছিনতাইয়ের সময় এক ছিনতাইকারীর ছুরির আঘাতে আরেক ছিনতাইকারীর মৃত্যু ঘটেছে। চলতি মাসে উত্তরায় এক কোটি ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ছিনতাই, মতিঝিলে প্রকাশ্যে গুলি করে ১৭ হাজার ডলার লুট এবং বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্র হাতে ছিনতাইয়ের একাধিক ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে-অপরাধীরা এখন সুযোগের অপেক্ষায় থাকা বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি নয়; তারা সংঘবদ্ধ, গতিশীল এবং সহিংস।

এখানেই রাষ্ট্রের কাছে মূল প্রশ্নটি রাখা জরুরি-অপরাধী ধরা পড়ার পরিসংখ্যান দিয়ে কি নাগরিক নিরাপত্তা পরিমাপ করা যায়, নাকি অপরাধ ঘটার আগেই তা ঠেকানোর সক্ষমতা দিয়েই রাষ্ট্রের সাফল্য বিচার করতে হবে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান ও গ্রেফতারের কথা বলছে। কিন্তু অভিযান চলার মধ্যেই যদি ছিনতাইয়ের ঘটনা অব্যাহত থাকে এবং প্রাণহানি ঘটে, তাহলে কৌশলটির কার্যকারিতা নিয়ে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের হিসাবে জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১৭৮টি মামলা হয়েছে। কিন্তু মামলার সংখ্যা প্রকৃত অপরাধের চিত্র নয়-এটি স্বীকার করারও কারণ রয়েছে। বহু ভুক্তভোগী মামলা করেন না, কেউ সাধারণ ডায়েরি করেন, আবার কেউ আইনগত প্রক্রিয়ার জটিলতায় যেতে চান না। ফলে অপরাধের সরকারি পরিসংখ্যানকে নিরাপত্তার প্রকৃত সূচক হিসেবে ব্যবহার করা নীতিনির্ধারণের জন্য বিপজ্জনক আত্মতুষ্টি তৈরি করতে পারে।

আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুলিশ নিজেই রাজধানীর শত শত ছিনতাইপ্রবণ স্থান এবং এক হাজারের বেশি সক্রিয় ছিনতাইকারীর তালিকার কথা জানিয়েছে। অর্থাৎ কোথায় ঝুঁকি বেশি এবং কারা অপরাধে সক্রিয়-তার একটি প্রাথমিক তথ্যভান্ডার রাষ্ট্রের হাতে রয়েছে। তাহলে প্রশ্ন থাকে, সেই তথ্য ব্যবহার করে অপরাধের পূর্বাভাসভিত্তিক প্রতিরোধব্যবস্থা কতটা কার্যকর? তালিকা তৈরি করাই যদি শেষ কথা হয়, তবে তা নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।

আমরা মনে করি, ছিনতাই দমনে এখনই প্রচলিত প্রতিক্রিয়াশীল পদ্ধতির বাইরে যেতে হবে। ছিনতাইপ্রবণ স্থান, সময় ও অপরাধের ধরন বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিভিত্তিক পুলিশি মোতায়েন করতে হবে। নজরদারি ক্যামেরা শুধু স্থাপন করলেই হবে না, তার কার্যকর পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। তালিকাভুক্ত অপরাধীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি জামিনে মুক্তির পর পুনরায় অপরাধে জড়ানোর প্রবণতাও নজরদারিতে আনতে হবে।

সবচেয়ে বড় আঘাত হানতে হবে ছিনতাইয়ের অর্থনৈতিক ভিত্তিতে। চোরাই মুঠোফোন, লুটের অর্থ ও অন্যান্য সামগ্রীর ক্রেতা, বিক্রেতা, মধ্যস্বত্বভোগী এবং আশ্রয়দাতাদের শনাক্ত না করে শুধু মাঠপর্যায়ের ছিনতাইকারী ধরলে অপরাধের সরবরাহব্যবস্থা অক্ষত থেকে যাবে। মাদক, অবৈধ অস্ত্র, কিশোর অপরাধচক্র ও চোরাই পণ্যের বাজারের সঙ্গে ছিনতাইয়ের যোগসূত্রও সমন্বিতভাবে তদন্ত করা জরুরি।

একই সঙ্গে পুলিশি জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কোন এলাকায় কতটি ঘটনা ঘটছে, কতজন তালিকাভুক্ত অপরাধী গ্রেফতার হয়েছে, কতজন পুনরায় অপরাধে জড়িয়েছে এবং কোন ছিনতাইপ্রবণ এলাকায় অপরাধ কমেছে-এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরিমাপ করা সম্ভব হবে। নাগরিক নিরাপত্তার নামে শুধু অভিযান পরিচালনার ঘোষণা যথেষ্ট নয়; তার ফলাফলও দৃশ্যমান হতে হবে।

একটি ব্যাগের জন্য রনজিনা পারভীনের জীবন চলে গেছে। এর আগে ছিনতাইকারীর টানে সোহেলি ইসলাম ও মুক্তা আক্তারের মৃত্যুও ঘটেছে। এসব মৃত্যু কেবল ফৌজদারি মামলার সংখ্যা নয়; এগুলো রাষ্ট্রের নাগরিক-নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য সতর্কসংকেত।
সানা/আপ্র/৩১/৮/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার বাধ্যে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত জরুরি
১৫ অক্টোবর ২০২৬

ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার বাধ্যে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত জরুরি

ফুট ওভারব্রিজ বা আন্ডারপাস থাকা সত্ত্বেও সামান্য শারীরিক পরিশ্রম বা অলসতার অজুহাতে চলন্ত গাড়ির সামনে...

দারিদ্র্য বিমোচনের ঋণ যখন দারিদ্র্যেরই নতুন ফাঁদ
১৫ অক্টোবর ২০২৬

দারিদ্র্য বিমোচনের ঋণ যখন দারিদ্র্যেরই নতুন ফাঁদ

ক্ষুদ্রঋণের মূল দর্শন ছিল দরিদ্র মানুষের হাতে পুঁজি তুলে দিয়ে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টি, আত্ম...

নির্ধারিত দামে এলপিজি নিশ্চিত করুন, ভোক্তাকে জিম্মি করা বন্ধ হোক
১৪ অক্টোবর ২০২৬

নির্ধারিত দামে এলপিজি নিশ্চিত করুন, ভোক্তাকে জিম্মি করা বন্ধ হোক

জ্বালানি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য উপকরণ। অথচ সরকার নির্ধারিত দামেও যদি রান্নার গ্যাস না মেল...

প্রবাসীর প্রাণ, আঞ্চলিক শান্তি ও মানবিক নিরাপত্তার কঠিন পরীক্ষা
১৩ অক্টোবর ২০২৬

প্রবাসীর প্রাণ, আঞ্চলিক শান্তি ও মানবিক নিরাপত্তার কঠিন পরীক্ষা

প্রবাসে উপার্জিত অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে, অসংখ্য পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখে। অথচ সেই উপার্জ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পরিচয় যা-ই হোক, চাঁদাবাজ-দখলদারদের ছাড় নয়: ডিএমপি কমিশনার

চাঁদাবাজ, ভূমি দখলবাজ ও মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় বা অবস্থান বিবেচনা না করে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ। এসব অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানো যাবে না বলেও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে ডিএমপি সদর দপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সেপ্টেম্বর মাসের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় উপস্থিত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এসব নির্দেশনা দেন কমিশনার। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন- কমিশনার যে নির্দেশনা দিয়েছেন, পুলিশ সদস্যরা তা বাস্তবে তা করতে পারবেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 2 দিন আগে