চালুর মাত্র নয় দিনের মধ্যেই ব্যাপক সাড়া ফেলেছে ‘ঘুষ.সাইট’। রোববার (৩০ আগস্ট) বিকেল ৪টা পর্যন্ত ওয়েবসাইটটিতে সারাদেশ থেকে ৯ হাজার ৬৬৫টি ঘুষের অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগে ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের মোট পরিমাণ ৩২১ থেকে ৩৩২ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে ওয়েবসাইটটির উদ্যোক্তারা।
তবে অভিনব এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে ১৭ বছর বয়সী শাহেদ শরীফ আহমেদের ব্যক্তিগত তিক্ত অভিজ্ঞতা। মায়ের মৃত্যুর পর তার পেনশনের টাকা তুলতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুষের দাবির মুখে পড়তে হয়েছিল। নিজের পাসপোর্ট করতেও ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতা হয় শাহেদের। এসব অভিজ্ঞতা থেকেই ঘুষের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ হিসেবে ‘ঘুষ.সাইট’ তৈরির চিন্তা আসে তার মাথায়।
ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বাবার সঙ্গে থাকেন শাহেদ। বর্তমানে ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীন কেমব্রিজ ইন্টারন্যাশনালের এ-লেভেলে পড়ছেন তিনি। তার বাবা শরীফুল ইসলাম (শামীম) আগে সৌদি আরবের একটি ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন।
শাহেদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার পূর্বপাড়া এলাকায়। তার মা আমিনা খাতুন ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর শারীরিক অসুস্থতায় মারা যান তিনি।
মায়ের পেনশন তুলতে ঘুষের অভিযোগ
পরিবারের অভিযোগ, চাকরির ১৩ বছরের মাথায় আমিনা খাতুনের মৃত্যুর পর তার পেনশন তহবিলের প্রায় ৭ লাখ টাকা তুলতে গিয়ে ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার, জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৮ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে ঘুষ হিসেবে ৩৮ হাজার টাকা দিতে হয়েছে বলে দাবি পরিবারের।
এ ছাড়া কল্যাণ তহবিলের ২ লাখ টাকা এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্য ৮ লাখ টাকা পেতে শিক্ষা কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ১ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেছেন বলেও অভিযোগ পরিবারের। টাকা না দিলে ফাইল এগোবে না বলে তাদের জানানো হয়েছিল বলে দাবি করেন শাহেদের বাবা।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে শাহেদ বলেন, ‘আম্মুর পেনশনের টাকার ফাইল আটকে রেখে লাখ টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছিল। এ ছাড়া, দেড় বছর আগে ও-লেভেল পরীক্ষার জন্য পাসপোর্ট করতে গেলে ফাইল আটকে রেখে ১ হাজার ৫০০ টাকা ঘুষ নেওয়ার পর তিন ঘণ্টার মধ্যে কাজ করে দেওয়া হয়। এই ক্ষোভ থেকেই ওয়েবসাইটটি বানাই।’
দুই ঘণ্টায় তৈরি ওয়েবসাইট
ভারতে প্রচলিত একটি ওয়েবসাইট দেখে এ উদ্যোগের অনুপ্রেরণা পান শাহেদ। পড়াশোনার পাশাপাশি অনলাইনে ওয়েবসাইট উন্নয়নের কাজ শিখেছেন তিনি। মাত্র দুই ঘণ্টায় ওয়েবসাইটটির প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করেন শাহেদ।
পরে বন্ধু ও সহপ্রতিষ্ঠাতা সাইফ কবিরের সহযোগিতায় ডোমেইন কেনা হয় এবং গত ২১ আগস্ট ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের পর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে উদ্যোগটি। পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে তাদের প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
ওয়েবসাইটটির দুই প্রতিষ্ঠাতা শাহেদ শরীফ আহমেদ ও সাইফ কবির। শাহেদ এর কোডিং ও কারিগরি দিক দেখছেন। আর সাইফ বিপণন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের বিষয়টি সামলাচ্ছেন। অভিযোগ যাচাই ও স্ক্রিনিংয়ের জন্য চার সদস্যের একটি মডারেশন টিমও রয়েছে।
শাহেদ জানান, আইনি ঝুঁকি এড়াতে বর্তমানে অভিযোগকারীদের নাম-পরিচয় বা নির্দিষ্ট অভিযুক্ত ব্যক্তির তথ্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হচ্ছে না। ভবিষ্যতে আইনি টিম গঠন কিংবা সরকারি সমর্থন পাওয়া গেলে পূর্ণাঙ্গ তথ্য ড্যাশবোর্ডে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
‘লক্ষ্য ঘুষের মাত্রা শূন্যে নামানো’
ওয়েবসাইট তৈরির উদ্দেশ্য সম্পর্কে শাহেদ বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল স্বচ্ছতা তৈরি করা। সরকারের টাকাগুলো কোথায় যাচ্ছে এবং কোথায় অপচয় হচ্ছে, তা সবাইকে জানানো। সরকারি অফিসে ঘুষ নেওয়া অত্যন্ত অন্যায় ও গর্হিত কাজ। আমরা বিষয়গুলো সবার সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে চাই, যেন মানুষ জানতে পারে বাংলাদেশে কীভাবে এসব অনিয়ম ঘটছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সরকার যদি এই তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে তা শুধু আমাদের উদ্যোগের সফলতা নয়, দেশের জন্যও বড় সুফল বয়ে আনবে। আমার মূল লক্ষ্য কোনো নীতিগত শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, আমি সোজা কথায় ঘুষের মাত্রা শূন্যে নামিয়ে আনতে চাই।’
ওয়েবসাইট চালুর পর কোনো হুমকি বা নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কা তৈরি হয়েছে কি না—জানতে চাইলে শাহেদ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আলহামদুলিল্লাহ, কোনো হুমকি বা নেতিবাচক ফোন পাইনি। শুরুতে এতটা ভাইরাল হবে, তা ভাবিনি। ভেবেছিলাম, সিভিতে যুক্ত করব। তবে ভবিষ্যতে কোনো আশঙ্কা তৈরি হতেও পারে।’
পুলিশের নজরে তরুণদের উদ্যোগ
তরুণদের এই উদ্যোগ পুলিশেরও নজরে এসেছে। ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, কোনো অনিয়ম বা ঘুষের তথ্য পাওয়া গেলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো আশঙ্কা তৈরি হলে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তা ও প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেবে।
শাহেদের বাবা শরীফুল ইসলাম বলেন, স্ত্রীর মৃত্যুর পর সরকারি পাওনা টাকা তুলতে গিয়ে তাকে বিভিন্ন জায়গায় ঘুষের মুখোমুখি হতে হয়েছে। অনেকটা বাধ্য হয়েই ঘুষ দিয়ে প্রায় ৭ লাখ টাকা তুলেছেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে বাকি ১০ লাখ টাকা পেতে ১ লাখ টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, ‘কাগজপত্র নিয়ে শিক্ষা অফিসে দৌড়ঝাঁপ করেও কাজ হচ্ছে না। উপজেলা শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী মজিবুর রহমান জানিয়েছেন, উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিস মিলে ১ লাখ টাকা না হলে কাজ হবে না। আমি জেদ ধরেছি, ঘুষ না দিয়ে পাওনা টাকা তুলব। দেশের স্বার্থে ছেলে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে আমার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।’
তবে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপজেলা শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. মজিবুর রহমান। রোববার বিকেলে সদর উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ে খোঁজ নেওয়া হলে তিনি বলেন, ‘কেউ আমার কাছে এলে সর্বাত্মক সহযোগিতা করি। আমার কাছে কাগজ নিয়ে এলে দ্রুত স্বাক্ষর করিয়ে দিয়ে দিই।’
এ বিষয়ে সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন বলেন, ঘুষ দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাকে কিছু জানাননি। এমন কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে মৃত শিক্ষকের সব বকেয়া দ্রুত পরিশোধের ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান তিনি।
এসি/আপ্র/৩১/০৮/২০২৬