গবেষণাগার ও হাসপাতালের গণ্ডি পেরিয়ে নিউরোটেকনোলজি বা স্নায়ুপ্রযুক্তি এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কর্মক্ষেত্র ও শোবার ঘরে প্রবেশ করছে। মস্তিষ্কের সংকেত বা কার্যকলাপ পরিমাপ করতে সক্ষম বিশেষ এয়ারবাড ইতিমধ্যে বাজারে এসেছে। প্রযুক্তিটি মানুষের ক্লান্তি, ঘুম ও মনোযোগের অবস্থা বুঝতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নিউরেবল ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাফি বা ইইজি সেন্সরযুক্ত হেডফোন তৈরি করেছে। এগুলো মস্তিষ্কের ক্লান্তি শনাক্ত করার পাশাপাশি মানসিক চাপ ও বার্নআউট কমাতে সহায়তা করতে পারে।
অন্যদিকে, রাতে নেক্সটসেন্সের স্মার্টবাড মস্তিষ্কের বিদ্যুচ্চালিত সংকেত বিশ্লেষণ করে ঘুমের চিত্র তৈরি করতে পারে। দিনের বেলায় এসব ইইজি সেন্সর ব্যবহারকারীর মনোযোগের সর্বোচ্চ সময় শনাক্ত করে কাজের সময়সূচি নির্ধারণেও সহায়তা করতে পারে।
বিষয়টি আর শুধু বিশেষায়িত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৩ সালে ইলেকট্রোডযুক্ত এয়ারপডের পেটেন্ট আবেদন করেছিল আইফোন নির্মাতা অ্যাপল। এর মাধ্যমে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পরিমাপ করা সম্ভব হবে। বাজারে কোটি কোটি এয়ারবাড থাকায় ইইজি প্রযুক্তিতে অ্যাপলের প্রবেশ এ প্রযুক্তিকে ব্যাপক ও মূলধারার ব্যবহারের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
দেখতে সাধারণ হলেও এ প্রযুক্তির সম্ভাব্য প্রভাব গভীর। ভবিষ্যতে শিশুরা ঘুম, পড়াশোনা কিংবা মনোযোগ দেওয়ার জন্য মস্তিষ্কের সংকেত শনাক্তকারী এয়ারবাড ব্যবহার করলেও সেটিকে তারা বিশেষ কোনো নিউরোপ্রযুক্তি হিসেবে বিবেচনা নাও করতে পারে। কর্মক্ষেত্রেও মস্তিষ্ক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা স্বাভাবিক প্রযুক্তিতে পরিণত হতে পারে।
মস্তিষ্কই হয়ে উঠছে ইন্টারফেইস
গবেষণাগার ও হাসপাতালের বাইরে নিউরোপ্রযুক্তির বিস্তারের ফলে মানুষের জৈবিক মস্তিষ্ক ও আশপাশের ডিজিটাল ব্যবস্থার সংযোগের মাধ্যম হিসেবে মস্তিষ্ক নিজেই ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। গবেষণায় এ অবস্থাকে ‘ব্রেন-অ্যাজ-ইন্টারফেইস’ যুগ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এর পেছনে দুটি বড় পরিবর্তন কাজ করছে। প্রথমত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় গবেষক ও প্রকৌশলীরা দেহে অস্ত্রোপচার বা আক্রমণাত্মক পদ্ধতি ছাড়াই সাধারণ সংকেত থেকে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অনুভূতি শনাক্ত করতে পারছেন। ফলে একসময় যে কাজের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রয়োজন হতো, তা এখন সাধারণ পরিধানযোগ্য সেন্সরেও সম্ভব হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নিউরাল ইন্টারফেইস নিয়ে কাজ করছে। মেটা এমন একটি রিস্টব্যান্ড তৈরি করেছে, যা পেশির স্নায়বিক সংকেত পড়ে নতুন চশমা বা অন্যান্য যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
নতুন প্রজন্ম ও নয়টি প্রশ্ন
নিউরোপ্রযুক্তি দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠলে এমন একটি প্রজন্ম বেড়ে উঠবে, যাদের কাছে এ প্রযুক্তি স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অংশ। তাদের ‘নিউরোটেকনোলজিকাল নেটিভস’ বা স্নায়ুপ্রযুক্তির যুগে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম হিসেবে দেখা যেতে পারে।
ডিজিটাল প্রযুক্তি যেখানে বাইরে থেকে মানুষের মনোযোগ, স্মৃতি ও পারস্পরিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করেছে, নিউরোপ্রযুক্তি সরাসরি মস্তিষ্কের তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভিন্ন মাত্রার প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে গবেষণায় নয়টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনা হয়েছে। নিউরো-ইন্টারফেইস কীভাবে দৈনন্দিন জীবনের নির্ভরযোগ্য অংশ হবে; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নিউরোপ্রযুক্তির মেলবন্ধনের প্রভাব কী হবে; মস্তিষ্কের তথ্য বা নিউরোডেটার নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে-এসব তার প্রথম সারির প্রশ্ন।
একই সঙ্গে শিশু ও টিনএজারদের আত্মপরিচয় ও আত্মোপলব্ধিতে দীর্ঘমেয়াদে এসব যন্ত্রের প্রভাব কী হবে, সরাসরি মস্তিষ্ক পর্যবেক্ষণের ফলে আত্মনিয়ন্ত্রণ কীভাবে বদলাবে, আর নীরব যোগাযোগ বা স্পিচ-ডিকোডিং প্রযুক্তির মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুদের ‘ইনার স্পিচ’ বা ভেতরের সংলাপ কীভাবে গড়ে উঠবে-এসব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এ প্রযুক্তির সুবিধা কারা পাবে, কারা নিউরোপ্রযুক্তির বৈষম্যের বাইরে থেকে যাবে এবং সমাজ ও কল্পনায় মস্তিষ্কের ধারণা কীভাবে বদলাবে-এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
নীতিমালা তৈরিতে দেরির সুযোগ নেই
প্রযুক্তির অগ্রগতি ইতিমধ্যেই নীতিমালা তৈরির প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। গবেষণার চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য অপেক্ষা না করে এখনই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরির প্রয়োজন বলে মত দেওয়া হচ্ছে। খনিশিল্পের মতো কিছু ক্ষেত্রে কর্মীদের শারীরিক ক্লান্তি পরিমাপ করতে ইইজি-যুক্ত যন্ত্র ব্যবহারের বাধ্যবাধকতাও চালু হয়েছে।
ইন্টারনেটের যুগে বেড়ে ওঠা মানুষকে যেমন ‘ডিজিটাল নেটিভ’ বলা হয়, তেমনি স্নায়ুপ্রযুক্তি ব্যবহার করে বেড়ে ওঠা জনগোষ্ঠীকেও ভবিষ্যতে নতুন প্রজন্ম হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে। তারা পুরোপুরি গড়ে ওঠার আগেই এ বিষয়ে গবেষণা, সামাজিক নীতি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি।
প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে দার্শনিক টমাস নাগেল মানুষের কল্পনার সীমাবদ্ধতা বোঝাতে প্রশ্ন তুলেছিলেন-একটি বাদুড় হওয়ার অনুভূতি কেমন? আজ সেই প্রশ্ন যেন মানুষের নিজের ভেতরেই ফিরে আসছে: স্নায়ুপ্রযুক্তির যুগে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর অনুভূতি আসলে কেমন হবে?
সানা/আপ্র/৩১/৮/২০২৬