জনপ্রিয় কোনো সংগীতশিল্পীর নতুন অ্যালবাম প্রকাশের দিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রাণঘাতী সড়ক দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়-এমন তথ্য উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়। গবেষকদের হিসাবে, ওই দিনগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনা প্রায় ১৫ শতাংশ এবং অতিরিক্ত প্রাণহানিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষকেরা ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ঘটে যাওয়া প্রায় ২ লাখ ৩৩ হাজার ৮০৯টি প্রাণঘাতী সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে এ ফল পেয়েছেন। এ জন্য দেশটির সরকারি দুর্ঘটনার তথ্যের সঙ্গে গান শোনার জনপ্রিয় মাধ্যম স্পটিফাইয়ের দৈনিক স্ট্রিমিংয়ের হিসাব মিলিয়ে দেখা হয়েছে।
গবেষণায় জনপ্রিয় শিল্পীদের এক দিনে সবচেয়ে বেশি স্ট্রিম হওয়া ১০টি অ্যালবামকে বিবেচনায় নেওয়া হয়। দেখা যায়, এসব অ্যালবাম প্রকাশের দিন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে সংশ্লিষ্ট শিল্পীদের গান শোনার হার গড়ে প্রায় ৪৩ শতাংশ বেড়ে যায়। এরপর অ্যালবাম প্রকাশের দিন ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার হারকে মুক্তির আগের ও পরের ১০ দিনের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেন গবেষকেরা।
ফলাফলে দেখা যায়, ওই ১০টি অ্যালবাম প্রকাশের দিন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় মোট ১৮২ জন অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ অ্যালবাম প্রকাশের প্রতিটি দিনে গড়ে ১৮ দশমিক ২ জন অতিরিক্ত মানুষের প্রাণ গেছে।
গবেষকদের ধারণা, নতুন অ্যালবামের গান চালানোর সময় চালকেরা পরিচিত প্লেলিস্টের বদলে নতুন গান খুঁজতে বা পছন্দের গান নির্বাচন করতে মুঠোফোন কিংবা গাড়ির মিউজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় বারবার মনোযোগ দেন। এতে কিছুক্ষণের জন্য হলেও চালকের দৃষ্টি সড়ক থেকে সরে যায়, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, অ্যালবাম প্রকাশের দিন দুর্ঘটনা বৃদ্ধির ঘটনাগুলো মূলত স্বাভাবিক আবহাওয়া ও দিনের আলোয় ঘটেছে। অর্থাৎ বৃষ্টি, কুয়াশা বা রাতের অন্ধকারের মতো প্রচলিত ঝুঁকিগুলো এসব দুর্ঘটনার প্রধান কারণ ছিল না।
মদ্যপ চালকদের মধ্যে একই ধরনের প্রবণতা স্পষ্ট না হলেও অ্যালকোহল গ্রহণ না করা চালকদের ক্ষেত্রে নতুন অ্যালবাম প্রকাশের দিনে অতিরিক্ত প্রাণহানি দেখা গেছে। এ সময়ে পুরুষ ও তরুণ চালকেরাই তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে ছিলেন। শুধু পুরুষ চালকদের ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত ১৩ দশমিক ৫টি মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
একইভাবে, গাড়িতে একা থাকা চালকদের দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেশি ছিল। গবেষকদের মতে, সঙ্গে যাত্রী থাকলে গান নির্বাচন বা মুঠোফোন ব্যবহারের মতো কাজে চালকের মনোযোগ কিছুটা ভাগ করে নেওয়া সম্ভব হয়। একা থাকলে সেই সুযোগ থাকে না।
গাড়ির বড় পর্দাও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি: গবেষণায় আধুনিক গাড়ির বড় ইনফোটেইনমেন্ট পর্দা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। গান খোঁজা, শিল্পীর নাম দেখা, গানের তালিকা পরিবর্তন কিংবা পরবর্তী গান সম্পর্কে জানতে চালকেরা এসব পর্দায় তাকান। এতে গাড়ি চালানোর সময় মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, নতুন গান শোনা বা মুঠোফোন ব্যবহারের কারণেই এসব প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটেছে-এমন সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক এই গবেষণায় নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি। ছুটির দিন, মৌসুমি ভ্রমণসহ আরো কিছু সম্ভাব্য প্রভাবক পুরোপুরি হিসাবের মধ্যে আনা সম্ভব হয়নি।
তবু গবেষকদের মতে, নতুন অ্যালবাম প্রকাশের সঙ্গে দুর্ঘটনা বৃদ্ধির যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে, তা আধুনিক গাড়ির বিনোদন ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার যথেষ্ট কারণ তৈরি করেছে।
গাড়িতে অতিরিক্ত টাচস্ক্রিন ব্যবহারের বিরুদ্ধেও সাম্প্রতিক সময়ে আপত্তি বাড়ছে। এরই মধ্যে ফোক্সভাগেন ও হুন্দাই টাচস্ক্রিননির্ভর নিয়ন্ত্রণ কমানোর উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। পোর্শে ও মার্সিডিজ-বেঞ্জের মতো নির্মাতারাও গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজের জন্য আবার প্রচলিত বোতাম ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ফিরিয়ে আনছে।
সানা/আপ্র/২১/৮/২০২৬