রেস্তোরাঁয় খাবার পরিবেশন করছে রোবট, কফি বানাচ্ছে রোবট, এমনকি ককটেলও তৈরি করছে যন্ত্র। এবার মানুষের মতো রোবটও যেন গ্রাহকদের কাছে হাত বাড়িয়ে বলছে—বকশিশ দিন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রোবটকে দেওয়া সেই টাকা শেষ পর্যন্ত যাচ্ছে কার পকেটে?
যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসের ভেনেশিয়ান হোটেলের ‘দ্য টিপসি রোবট’ বারে দুই রোবটিক হাত দিয়ে তৈরি করা হয় ককটেল। একটি মার্গারিটার দাম ১৭ ডলার। এর সঙ্গে যোগ হয় ১০ শতাংশ সেবা ফি। পাশাপাশি গ্রাহকদের বকশিশ দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে।
নিউইয়র্কের ‘আর্টলি কফি’তেও বকশিশ চাইছে রোবট বারিস্তা। নিউ জার্সির নিউয়ার্ক বিমানবন্দরের একটি কর্মীহীন স্বয়ংক্রিয় দোকানে পানির বোতল কিনলেও বকশিশ দেওয়ার পরামর্শ দেখা যাচ্ছে। আবার অরেগনের পোর্টল্যান্ডের ‘টপ বার্মিজ’ রেস্তোরাঁয় অর্ডার নেন মানুষ, কিন্তু খাবার টেবিলে পৌঁছে দেয় রোবট।
মানুষ খাবার পরিবেশন করলে ভালো সেবার জন্য বকশিশ দিতে আপত্তি করেন না অনেকেই। কিন্তু রোবটের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। কারণ, রোবটকে দেওয়া সেই অর্থ শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাচ্ছে, তা অনেক সময় গ্রাহকের কাছে পরিষ্কার নয়।
রোবটের বকশিশ যাচ্ছে কার কাছে?
বকশিশ সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, রোবটকে বকশিশ দেওয়ার বিষয়টি ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের লেহাই বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক হলোনা ওচসের মতে, কিছু প্রতিষ্ঠান রোবটের নামে পাওয়া বকশিশ নিজেদের আয় হিসেবে রেখে দেওয়ার সুযোগ নিতে পারে। মূল প্রশ্ন হলো—এই অর্থ থেকে কে লাভবান হচ্ছে এবং এর মূল্যই বা কে দিচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্রে কর্মীদের দেওয়া বকশিশ থেকে প্রতিষ্ঠান, মালিক বা ব্যবস্থাপকদের অংশ নেওয়া আইনত নিষিদ্ধ। কিন্তু বকশিশ যদি কোনো যন্ত্রের নামে দেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে আইনের ফাঁক থেকে যেতে পারে। রোবটের নামে দেওয়া অর্থের প্রকৃত মালিক কে—এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি হয়নি।
অবশ্য সব প্রতিষ্ঠান রোবটের বকশিশ নিজেদের কাছে রাখছে না। ‘দ্য টিপসি রোবট’ ও ‘আর্টলি কফি’ জানিয়েছে, তারা পাওয়া বকশিশ মানবকর্মীদের মধ্যে ভাগ করে দেয়। কোম্পানি এর কোনো অংশ নেয় না। এমনকি গ্রাহকদের আপত্তির পর ‘আর্টলি কফি’ অনেক জায়গায় রোবটের জন্য বকশিশ দেওয়ার ডিজিটাল ব্যবস্থাও বন্ধ করেছে।
রোবট কি মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে?
রোবট ব্যবহারের পক্ষে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর যুক্তি, সেবা খাতে কর্মীর সংকট রয়েছে। তাই রোবট মানুষের কাজ কেড়ে নেওয়ার বদলে কর্মীদের সহযোগিতা করতে পারে।
‘আর্টলি কফি’র কর্মকর্তাদের ভাষ্য, রোবট ব্যবহারের উদ্দেশ্য খরচ কমিয়ে মানুষের চাকরি কমানো নয়। প্রযুক্তির মাধ্যমে কর্মীদের কাজ সহজ করা এবং গ্রাহকদের নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা দেওয়াই তাদের লক্ষ্য।
তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, রোবট ব্যবহারের আড়ালে কম বেতন দেওয়ার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। তাদের প্রশ্ন, রোবট যদি কাজই করে, তাহলে গ্রাহকের কাছ থেকে আবার বকশিশ নেওয়ার যৌক্তিকতা কী?
রোবটকে বকশিশ দেবেন?
বকশিশ দেওয়ার অন্যতম কারণ হলো ভালো সেবার জন্য কর্মীকে পুরস্কৃত করা। পাশাপাশি সেবা খাতের অনেক কর্মী তুলনামূলক কম বেতন পাওয়ায় বকশিশ তাদের বাড়তি সহায়তা দেয়। কিন্তু রোবটের ক্ষেত্রে এসব যুক্তি কতটা প্রযোজ্য?
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাইকেল লিনের মতে, রোবটকে বকশিশ দেওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই। কারণ রোবট ভালো সেবা দিলেও তার বাড়তি আয়ের প্রয়োজন নেই, আবার কম বেতনের সমস্যাও নেই।
তারপরও বাস্তবে অনেক মানুষ রোবটকে বকশিশ দিতে রাজি হচ্ছেন। এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ রোবট বারটেন্ডারকে বকশিশ দিতে আগ্রহী। তবে যারা আগে রোবট বারটেন্ডারের সেবা নিয়েছেন, তাদের মধ্যে বকশিশ দেওয়ার আগ্রহ তুলনামূলক বেশি।
আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বকশিশের টাকা মানবকর্মীদের দেওয়া হবে—এ কথা জানলে গ্রাহকদের মনোভাব অনেকটাই বদলে যায়। গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রায় ৪২ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, বকশিশ মানবকর্মীদের কাছে যাবে জানলে তারা রোবটের সেবার জন্যও বকশিশ দিতে রাজি।
ফলে রোবটকে বকশিশ দেওয়া ভবিষ্যতের স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে উঠবে, নাকি প্রযুক্তির আরেকটি সাময়িক প্রবণতা হিসেবেই থাকবে—তা অনেকটাই নির্ভর করছে গ্রাহকদের ওপর। মানুষ যদি এই ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও একসময় রোবটের নামে বকশিশ চাওয়া বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে।
রোবটের হাত সামনে বাড়ানো থাকলেও তাই আসল প্রশ্নটা অন্য জায়গায়—বকশিশের টাকা শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
সূত্র: বিবিসি
এসি/আপ্র/২০/০৮/২০২৬