গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬

মেনু

সাধারণ হোটেলে এক কাপ চা ৩০ টাকা: জীবনযাত্রায় লাগামহীন দাম

খান মুহঃ আশরাফুল আলম

খান মুহঃ আশরাফুল আলম

প্রকাশিত: ১৮:৫৮ পিএম, ১৭ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ২০:০৮ এএম ২০২৬
সাধারণ হোটেলে এক কাপ চা ৩০ টাকা: জীবনযাত্রায় লাগামহীন দাম
ছবি

ছবি সংগৃহীত

প্রতিদিন সকালের স্নিগ্ধ আলো কিংবা ব্যস্ত দুপুরের ক্লান্তি কাটাতে এক কাপ গরম চা আমাদের জীবনের এক অবধারিত অংশ। রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে করপোরেট অফিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা—সবারই চায়ের কাপের ধোঁয়ায় দিন শুরু বা কাটার অভ্যাস রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি চায়ের দোকানগুলোতে চোখ পড়লে এক অদ্ভুত ও নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। পাড়ার অলিগলির সাধারণ টং দোকান, ফুটপাতের চায়ের ঠোঁট কিংবা মাঝারি মানের কোনো হোটেলে এক কাপ সাধারণ চায়ের দাম হাঁকা হচ্ছে ৩০ টাকা! যে চা কিছুদিন আগেও ৫ বা ১০ টাকায় পাওয়া যেত, তার এমন আকাশচুম্বী দাম সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এক মস্ত বড় আঘাত। এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে যেমন রয়েছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির অজুহাত, তেমনি রয়েছে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর সীমাহীন মুনাফালোভ এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারির চরম ঘাটতি।

মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি আর জীবনযাত্রার ব্যয় এখন এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। চাল, ডাল, তেল, চিনি থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দামের হু হু করে বাড়ার গল্প সবার জানা। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বাড়িভাড়া, যাতায়াত খরচ ও চিকিৎসাব্যয়। এই সার্বিক পরিস্থিতিতে একজন খেটে খাওয়া মানুষের দৈনিক আয়ে টান পড়েছে মারাত্মকভাবে। একটি চায়ের কাপ সাধারণ মানুষের কাছে কেবল পানীয় নয়, এটি স্বল্প আয়ের মানুষের সামান্য একটু স্বস্তি বা বিশ্রামের মাধ্যম। কিন্তু যখন দেখা যায়, একজন দিনমজুর বা রিকশাচালক দিনশেষে যে কষ্টার্জিত অর্থ উপার্জন করেন, তার একটি বড় অংশ চলে যায় কেবল এক কাপ চায়ের পেছনে, তখন তা অমানবিক ঠেকে। ৩০ টাকা দিয়ে এক কাপ চা কেনার অর্থ হলো—দিনমজুরের ঘামে ভেজা উপার্জনের একটা অযৌক্তিক অপচয়। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আজ তলানিতে ঠেকেছে। অথচ বাজারে নিত্যপণ্যের মতো চায়ের মতো অতি সাধারণ একটি উপাদানের দামও নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

অবিবেচিত মুনাফাখোর ও লাগামহীন দামের সংস্কৃতি: আমাদের সমাজে একশ্রেণির অবিবেচিত ব্যবসায়ী রয়েছেন, যারা যেকোনো সংকট বা মূল্যস্ফীতিকে নিজেদের অতিরিক্ত মুনাফা লুটে নেওয়ার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেন। কাঁচামালের দাম সামান্য বাড়লে তারা পণ্যের দাম বাড়ান কয়েকগুণ। চায়ের ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় ঘটে না। চায়ের প্রধান উপাদানগুলো হলো- চা পাতা, চিনি, দুধ, গ্যাস বা জ্বালানি এবং পানি। হিসাব কষে দেখলে বোঝা যায়, এক কাপ চা তৈরিতে যে পরিমাণ চা পাতা বা চিনি ব্যবহার করা হয়, তার প্রকৃত উৎপাদন খরচ ১০ থেকে ১২ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। অথচ সেই চা ৩০ টাকায় বিক্রি করার পেছনে যে মুনাফা অর্জিত হয়, তাকে কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত বলা চলে না। এটি সম্পূর্ণভাবে একশ্রেণির অতি মুনাফাখোর ব্যবসায়ীর লোভের বহিঃপ্রকাশ। তাদের এই অবিবেচিত আচরণের কারণে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে প্রতিদিন। সংকটের সুযোগ নিয়ে যারা অতিরিক্ত মুনাফা লুটে নেয়, তারা মূলত সমাজের এক ধরনের নীরব শোষক। তাদের এই লাগামহীন দৌরাত্ম্যের কারণে বাজারে চায়ের দামের কোনো স্থিরতা বা শৃঙ্খলা নেই।

আইন, তদারকি ও দেখভালের চরম অভাব: আমাদের দেশে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, ভেজাল রোধ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের জন্য সুনির্দিষ্ট আইন ও সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বাজার মনিটরিংয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, হোটেল ও রেস্তোরাঁ খাতে এই আইনের প্রয়োগ কতটুকু কার্যকর? সাধারণ হোটেল এবং চায়ের দোকানগুলোতে পণ্যের দামের কোনো তালিকা বা মূল্য তালিকা টানানোর নিয়ম থাকলেও তা মানার কোনো বালাই নেই।

বিক্রেতারা ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করেন এবং ক্রেতারা প্রতিবাদ করলে নানা অজুহাত দেখান। রান্নার গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, দোকানভাড়া বৃদ্ধি কিংবা দুধের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে চায়ের দাম রাতারাতি তিনগুণ করে ফেলা হয়। অথচ রাষ্ট্রীয়ভাবে এই ছোটখাটো হোটেল ও চায়ের দোকানগুলোর ওপর কোনো নজরদারি বা তদারকি নেই। ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর বড় বড় সুপারশপ বা নামি-দামি রেস্তোরাঁয় অভিযান চালালেও পাড়া-মহল্লার অলিগলির হোটেলগুলোয় তাদের উপস্থিতি প্রায় অনুপস্থিত বললেই চলে। এই প্রশাসনিক উদাসীনতা ও দেখভালের অভাবের সুযোগেই অসাধু ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দাম বৃদ্ধির সাহস পাচ্ছে। 

রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা: বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও সেবা রাখতে রাষ্ট্রীয় নজরদারির বিকল্প নেই। চায়ের মতো অতি সাধারণ পানীয়ের দাম ৩০ টাকায় পৌঁছে যাওয়া রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের ব্যর্থতারই একটি ছোট প্রতিচ্ছবি। রাষ্ট্র যদি প্রতিটি খাতের ওপর কঠোর নজরদারি না করে, তবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। অবিবেচিত মুনাফাখোরদের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সব হোটেল ও রেস্তোরাঁয় দৃশ্যমান স্থানে পণ্যের মূল্যতালিকা টানানো বাধ্যতামূলক করতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে যারা অতিরিক্ত দাম আদায় করছে, তাদের জরিমানা এবং আইনের আওতায় আনতে হবে। শুধু তাই নয়, বাজার সিন্ডিকেট এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের কঠোরহস্টে দমন করতে হবে- যাতে সাধারণ মানুষ একটু স্বস্তিতে নিঃশ্বাস ফেলতে পারে।

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। তা হলো-

মূল্য নির্ধারণ ও তালিকা প্রদর্শন: জেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় পৌরসভার উদ্যোগে প্রতিটি হোটেল ও চায়ের দোকানে পণ্যের সুনির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণ করে দিতে হবে এবং তা দৃশ্যমান স্থানে ঝুলিয়ে রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

নিয়মিত মনিটরিং: ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনকে আরও সক্রিয় হতে হবে। পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতেও যাতে নিয়মিত তদারকি চলে, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

সচেতনতা বৃদ্ধি: ভোক্তাদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। যেখানে সেখানে অতিরিক্ত দাম রাখলে তার প্রতিবাদ করতে হবে এবং প্রয়োজনে ভোক্তা অধিকারে অভিযোগ জানাতে হবে।

জ্বালানি ও কাঁচামাল নিয়ন্ত্রণ: ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য রান্নার গ্যাস ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম সহনীয় রাখতে সরকারি ভর্তুকি বা বিশেষ সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে, যাতে তারা বাধ্য হয়ে পণ্যের দাম আকাশচুম্বী না করে।

আইনের কঠোর প্রয়োগ: অতিরিক্ত মুনাফাখোরদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক শাস্তি ও জরিমানা নিশ্চিত করতে হবে, যা অন্যদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।

পরিশেষে বলা যায়, এক কাপ চায়ের দাম ৩০ টাকা হয়ে যাওয়া কেবল একটি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়; আমাদের সামাজিক অবক্ষয় এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার একটি নগ্ন চিত্র। রাষ্ট্র যদি সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ও স্বস্তির কথা চিন্তা করে, তবে এই ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের অরাজকতা দূর করতে হবে। চায়ের মতো অতি সাধারণ একটি পানীয়ের দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে তা বৃহত্তর অর্থনীতিতে সরকারের নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতাকেই নির্দেশ করবে। অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ, কঠোর নজরদারি এবং অবিবেচিত মুনাফাখোরদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হোক- এটিই সাধারণ মানুষের আকুল প্রত্যাশা।

লেখক: সাংবাদিক ও বিশ্লেষক
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

কেএমএএ/আপ্র/১৭.০৮.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

ছয় মাসের আয়না
১৭ আগস্ট ২০২৬

ছয় মাসের আয়না

শামসুল আলমকোনো সরকার ছয় মাসে দেশ বদলে ফেলতে পারে না। এমনকি কোনো মানুষও ছয় মাসে নিজের স্বভাব বদলাতে প...

বাংলাদেশে কি পুনরায় জঙ্গিবাদের উত্থান হতে যাচ্ছে?
১৬ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশে কি পুনরায় জঙ্গিবাদের উত্থান হতে যাচ্ছে?

সাবির মুস্তাফাবাংলাদেশে কি সশস্ত্র জঙ্গিবাদ পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে? সাম্প্রতিক কিছু খবর এবং আন্তর...

কর বাড়িয়ে আদৌ কি ধূমপান কমানো সম্ভব?
১৬ আগস্ট ২০২৬

কর বাড়িয়ে আদৌ কি ধূমপান কমানো সম্ভব?

মিঠুন বৈদ্যবাংলাদেশ সরকার দেশকে তামাকমুক্ত করার যে অঙ্গীকার করেছে, তা কেবল জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি নয়,...

খালেদা জিয়া: সাহস, সংগ্রাম ও নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি
১৫ আগস্ট ২০২৬

খালেদা জিয়া: সাহস, সংগ্রাম ও নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি

জহিরুল ইসলাম জহির===বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নাম কেবল একটি দলের পরিচয় বহন করে না; সময়ের বাঁক...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বিএনপি সরকারের ছয় মাস: প্রত্যাশা কতটা, প্রাপ্তি কতখানি

আজ ১৭ আগস্ট সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে। এর আগে ছয় মাসের কাজের মূল্যায়নে সরকার যেমন বেশ কিছু অর্জনের কথা বলছে, তেমনি বিরোধী রাজনৈতিক দল, অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন পর্যায়ের নাগরিকদের প্রশ্নও সামনে এসেছে। সরকারের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দাবি করেছেন, ছয় মাসের লক্ষ্য অনুযায়ী মোটামুটি সব কর্মসূচিই পূরণ হয়েছে-কোথাও ৯০, কোথাও ৯৫ এবং কোথাও শতভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে। প্রিয় পাঠক, সরকার ভালো করছে নাকি মন্দ করছে? হ্যাঁ বা না জানান।

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 17 ঘন্টা আগে