মিঠুন বৈদ্য
বাংলাদেশ সরকার দেশকে তামাকমুক্ত করার যে অঙ্গীকার করেছে, তা কেবল জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার জাতীয় অঙ্গীকার। এই লক্ষ্য অর্জনের পথে গত অর্থবছরে গৃহীত একটি সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে আশার সঞ্চার করেছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেট প্রস্তাবেও সিগারেটের ওপর আরোপিত সম্পূরক শুল্কে মূল্যস্তরভিত্তিক ভিন্নতা বজায় ছিল। কিন্তু একই অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে ৯ জানুয়ারি ২০২৫-এ এনবিআর কর্তৃপক্ষ এসআরও-১৬ জারি করে সব মূল্যস্তরের সিগারেটের ওপর ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করে দীর্ঘদিনের বৈষম্যমূলক কর কাঠামো সংস্কারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
অনেকেই তখন প্রশ্ন তুলেছিলেন, কর বাড়িয়ে আদৌ কি ধূমপান কমানো সম্ভব! ২০২৫ সালে দেশব্যাপী পরিচালিত একটি গবেষণার ফলাফল সেই প্রশ্নের গুরুত্বপূর্ণ একটি উত্তর সামনে এনেছে।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ১৮-৩০ বছর বয়সী তরুণ ধূমপায়ীদের ৩৭.৩৪ শতাংশ জানিয়েছেন যে, কর ও মূল্য বৃদ্ধির পর তারা তাদের সিগারেট ব্যবহারের পরিমাণ কমিয়েছেন। এই ফলাফল তামাকজাত দ্রব্যের মূল্য ও কর বৃদ্ধির সঙ্গে তরুণদের তামাক ব্যবহার হ্রাসের একটি উল্লেখযোগ্য সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয় এবং তামাক নিয়ন্ত্রণে মূল্যভিত্তিক নীতির কার্যকারিতার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ উপস্থাপন করে। অর্থাৎ, কর বৃদ্ধি কেবল রাজস্ব বাড়ানোর উপায় নয়, এটি জনস্বাস্থ্য রক্ষার একটি পরীক্ষিত নীতিগত হাতিয়ার।
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কার্যকর কর বৃদ্ধি তামাকের ব্যবহার হ্রাসে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ফলাফল বয়ে আনতে সক্ষম। দেশের অধিকাংশ ধূমপায়ী ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সেই ধূমপানে আসক্ত হয়। এ বয়সেই যদি মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে ধূমপান কমানো যায় কিংবা নতুন তরুণদের ধূমপান শুরু করা নিরুৎসাহিত করা যায়, তাহলে আগামী দুই দশকে তামাকজনিত রোগ, অকালমৃত্যু এবং স্বাস্থ্য ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। ফলে তরুণদের আচরণগত এই পরিবর্তন কেবল বর্তমানের একটি পরিসংখ্যান নয়; ভবিষ্যতের একটি সুস্থ বাংলাদেশের ইঙ্গিত।
ওই আশাব্যঞ্জক চিত্রের পাশাপাশি গবেষণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও দিয়েছে। প্রায় ৫৯ শতাংশ তরুণ ধূমপায়ী কর বৃদ্ধির পরও তাদের ধূমপানের অভ্যাস অপরিবর্তিত রেখেছেন। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, কর বৃদ্ধি ব্যর্থ হয়েছে। বরং গবেষণাটি দেখিয়েছে, ধূমপান ছাড়ার পরিবর্তে ২১.২৩ শতাংশ তরুণ ধূমপায়ী কম দামের ব্র্যান্ডে সুইচ করেছেন অথবা নতুন ব্র্যান্ড ব্যবহার শুরু করেছেন- যা সঠিক আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। কেউ কেউ আবার নাস্তা, যাতায়াত, পারিবারিক ব্যয়, এমনকি সঞ্চয় কমিয়ে সিগারেট কেনা অব্যাহত রেখেছেন। এই বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে নিয়ে আসে- মূল সমস্যা লুকিয়ে আছে বর্তমান কর কাঠামোতে।
বাংলাদেশে বহুস্তরের মূল্যভিত্তিক কর ব্যবস্থা বিদ্যমান। সরকারের নির্ধারিত চারটি মূল্যস্তরের বাইরে বাজারে আরো বহু দামের সিগারেট সহজেই পাওয়া যায়। ফলে দাম বাড়লেও একজন ধূমপায়ীর জন্য ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার পরিবর্তে কম দামের অন্য ব্র্যান্ডে চলে যাওয়া সহজ হয়ে যায়। তামাক কোম্পানিগুলোও নতুন ব্র্যান্ড বাজারে এনে এবং বিভিন্ন মূল্য কৌশল ব্যবহার করে এ সুযোগকে কাজে লাগায়। ফলে কর বৃদ্ধির জনস্বাস্থ্যগত সুফলের একটি অংশ হারিয়ে যায়। অর্থাৎ গত অর্থবছরের কর বৃদ্ধি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রমাণ করেছে, মূল্য বৃদ্ধি কার্যকর। কিন্তু বর্তমান কর কাঠামো ওই কার্যকারিতাকে পূর্ণমাত্রায় কাজে লাগাতে পারছে না।
এ কারণেই এখন সময় এসেছে বিচ্ছিন্নভাবে কর বাড়ানোর পরিবর্তে একটি শক্তিশালী, টেকসই ও প্রাতিষ্ঠানিক তামাক করনীতি প্রণয়নের। এমন একটি নীতি, যা প্রতিবছর মূল্যস্ফীতি ও মানুষের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তামাকের কর সমন্বয় করবে এবং বহুস্তরবিশিষ্ট মূল্য কাঠামো ধীরে ধীরে সরল করবে। এর পাশাপাশি কম দামের সিগারেট ও নতুন ব্র্যান্ডের দিকে স্থানান্তরের মাধ্যমে কর বৃদ্ধির প্রত্যাশিত প্রভাব সীমিত করার সুযোগ কমিয়ে আনবে এবং সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে।
গবেষণায় আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। ধূমপান কমানোর ক্ষেত্রে মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা, পারিবারিক উৎসাহ এবং ধূমপানমুক্ত পরিবেশও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। অর্থাৎ, কর বৃদ্ধি কখনোই এককভাবে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল বয়ে আনে না বরং এটি জনসচেতনতা, কার্যকর আইন বাস্তবায়ন এবং শক্তিশালী তামাক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বিত হলে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ফলাফল দেয়। তাই শক্তিশালী তামাক করনীতির পাশাপাশি বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন, সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তামাকবিরোধী কার্যক্রম সম্প্রসারণ, ধূমপান ত্যাগে সহায়তা বৃদ্ধি এবং খুচরা শলাকা বিক্রি বন্ধের মতো পদক্ষেপও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
২০১০-১১ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশ সরকারের বরাদ্দ প্রায় ৯ গুণ বৃদ্ধি পেলেও রোগীর ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয় তো কমেইনি, বরং সংশ্লিষ্ট সবক্ষেত্রে এই খরচ অনেকাংশেই বেড়েছে। অর্থাৎ সমস্যা কেবল বরাদ্দের পরিমাণে নয়, বরং ওই বরাদ্দের ব্যবহার ও অগ্রাধিকারে। এক্ষেত্রে তামাকের ওপর আরোপিত বর্ধিত কর থেকে প্রাপ্ত অতিরিক্ত রাজস্ব ধূমপান ত্যাগ, অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণসহ সার্বিক রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে ব্যয় করা যেতে পারে। তামাক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অনেক সময় কর বৃদ্ধিকে কেবল রাজস্ব আদায়ের বিষয় হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবতাটা ভিন্ন এবং আরো অনেক বিস্তৃত।
কার্যকর তামাক করনীতি একই সঙ্গে তামাক ব্যবহার কমানো, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি এই তিনটি লক্ষ্য অর্জন করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। ফলে এটি প্রমাণিত যে একটি শক্তিশালী তামাক করনীতি শুধু স্বাস্থ্য নীতি নয়, একটি অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক নীতিও।
উল্লেখ্য, দেশের ক্রমবর্ধমান অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) নিয়ন্ত্রণে ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ একটি ঐতিহাসিক যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছে এবং সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই চুক্তিপত্রে চিকিৎসাকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিবর্তে অস্বাস্থ্যকর খাদ্য, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও তামাক ব্যবহার হ্রাসে জোর দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে গত অর্থবছরের কর বৃদ্ধি ইতোমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছে যে মূল্য বৃদ্ধি তরুণদের ধূমপান কমাতে সক্ষম। অন্যদিকে, গবেষণা এটাও স্পষ্ট করেছে যে, বিদ্যমান বহুস্তরের কর ব্যবস্থা এবং তামাক কোম্পানির মূল্য কৌশল এই ইতিবাচক প্রভাবকে সীমিত করে দিচ্ছে। তাই এখন আর শুধু করের হার বাড়ানোর আলোচনা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি তামাক করনীতি- যা রাজনৈতিক পরিবর্তন বা বার্ষিক বাজেটের ওপর নির্ভরশীল হবে না; বরং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা কেন্দ্র করে একটি ধারাবাহিক নীতিগত কাঠামো গড়ে তুলবে।
সবশেষে বলা যায়, গত অর্থবছরের কর বৃদ্ধি আমাদের একটি বাস্তব শিক্ষা দিয়েছে যে কর বৃদ্ধির মাধ্যমে তামাকজাত দ্রব্যের মূল্য বাড়ানো তামাক নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফলাফল দেয়। এখন সেই সাফল্যকে নীতিগতভাবে স্থায়ী রূপ দেওয়ার সময়। যদি সরকার এই প্রমাণভিত্তিক অভিজ্ঞতার আলোকে একটি শক্তিশালী, বিজ্ঞানসম্মত ও টেকসই তামাক করনীতি প্রণয়ন করে, তবে আগামী দিনে আরও বেশি তরুণ ধূমপান কমাবে, নতুন প্রজন্মের ধূমপান শুরু করার প্রবণতা কমবে এবং সরকারের তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন অনেক বেশি সম্ভাবনাময় হয়ে উঠবে।
আজকের ৩৭.৩৪ শতাংশই হতে পারে আগামী দিনের আরো বড় পরিবর্তনের সূচনা- যদি আমরা এই সঠিক নীতিগত সুযোগটি কাজে লাগাতে পারি।
লেখক: উন্নয়নকর্মী ও গবেষক
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/১৬.০৮.২০২৬