চাঁদ যখন সূর্যকে আড়াল করে দিনের আলোকে হঠাৎ ম্লান করে দেয়, তখন পৃথিবীর মানুষের কাছে তা হয়ে ওঠে এক বিরল মহাজাগতিক দৃশ্য। কিন্তু বিজ্ঞানীদের কাছে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ শুধু চোখধাঁধানো কোনো ঘটনা নয়; এটি সূর্য, তার চারপাশের বায়ুমণ্ডল এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝার এক অসাধারণ প্রাকৃতিক গবেষণাগার।
গত ১২ আগস্টের পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণে সেই সুযোগই কাজে লাগিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। গ্রহণের পূর্ণগ্রাস পথ গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, উত্তর রাশিয়া, আটলান্টিক মহাসাগর, স্পেন ও পর্তুগালের একটি ছোট অংশ দিয়ে অতিক্রম করে। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিস্তীর্ণ এলাকায় দেখা যায় আংশিক সূর্যগ্রহণ।
এবারের গ্রহণে লাখ লাখ মানুষ আকাশের দিকে তাকালেও বিজ্ঞানীদের নজর ছিল সূর্যের এমন কিছু অঞ্চলের দিকে, যা সাধারণ সময়ে পৃথিবী থেকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত কঠিন। চাঁদ সূর্যের চাকতি পুরোপুরি ঢেকে দিলে সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল-করোনা-স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সূর্যের এই অতি উত্তপ্ত ও গতিশীল অঞ্চল পর্যবেক্ষণের বিরল সুযোগই পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণকে বিজ্ঞানীদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
সূর্যের করোনা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ: সূর্যের দৃশ্যমান পৃষ্ঠের তুলনায় করোনা অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। অথচ সূর্যের প্রচণ্ড উজ্জ্বলতার কারণে স্বাভাবিক অবস্থায় করোনার কাছের অংশ ভালোভাবে দেখা যায় না। বিশেষ যন্ত্র দিয়ে সূর্যের চাকতি আড়াল করে কৃত্রিমভাবে গ্রহণের মতো পরিবেশ তৈরি করা যায়। কিন্তু প্রাকৃতিক পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণে চাঁদ সূর্যকে এমনভাবে ঢেকে দেয়, যা করোনার একেবারে অভ্যন্তরীণ অংশ পর্যবেক্ষণের জন্য অনন্য সুবিধা তৈরি করে।
এই অঞ্চল পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা জানতে চান, সূর্যের বিপুল শক্তি কীভাবে তার বাইরের বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে এবং কীভাবে সেখান থেকে সৌরবায়ু মহাশূন্যে প্রবাহিত হয়। সৌরবায়ুর পরিবর্তন পৃথিবীর মহাকাশ পরিবেশেও প্রভাব ফেলে।
এ কারণে সূর্যগ্রহণের তথ্য ভবিষ্যতে মহাকাশের আবহাওয়া বা সৌর কার্যকলাপের পূর্বাভাস আরো নির্ভুল করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। শক্তিশালী সৌর কার্যকলাপের কারণে কৃত্রিম উপগ্রহ, যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এবার আকাশেই গবেষণাগার বানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা: এবারের গ্রহণে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা একাধিক গবেষণা কর্মসূচি পরিচালনা করেছে। সংস্থাটি উচ্চ আকাশে বৈজ্ঞানিক বেলুন ও বিশেষ গবেষণাবিমান ব্যবহার করে গ্রহণের সময় সূর্য ও পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেছে।
নাসার একটি বিশেষ গবেষণাবিমান প্রায় ১৫ কিলোমিটার উচ্চতায় উঠে গ্রহণ পর্যবেক্ষণ করেছে। ওই উচ্চতায় বিমানটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বড় একটি অংশের ওপরে অবস্থান করায় মেঘ, ধুলা ও জলীয়বাষ্পের কারণে পর্যবেক্ষণে যে বাধা তৈরি হয়, তা অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হয়েছে। গবেষকেরা সূর্যের করোনাকে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেয়েছেন।
আইসল্যান্ডেও নাসা-সমর্থিত গবেষণা দলগুলো বিপুলসংখ্যক বৈজ্ঞানিক বেলুন ব্যবহার করেছে। হঠাৎ দিনের আলো কমে গিয়ে অন্ধকার নেমে আসার ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের নিচের স্তরে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে, সেসব তথ্য সংগ্রহ করাই ছিল এসব গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য।
অর্থাৎ এবার বিজ্ঞানীরা শুধু সূর্যের দিকে তাকাননি; একই সঙ্গে সূর্যগ্রহণের কারণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে সৃষ্ট তাৎক্ষণিক পরিবর্তনও পর্যবেক্ষণ করেছেন।
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলেও পড়ে গ্রহণের ছাপ: সূর্যগ্রহণের সময় পৃথিবীর নির্দিষ্ট অঞ্চলে সূর্যালোক হঠাৎ কমে যায়। এর ফলে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা, বায়ুপ্রবাহ এবং আধানযুক্ত কণার আচরণে পরিবর্তন ঘটতে পারে। এই পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা সূর্যের বিকিরণ কীভাবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে প্রভাবিত করে, সে সম্পর্কে আরো পরিষ্কার ধারণা পেতে পারেন।
বিশেষ করে বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে সূর্যের শক্তির প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সূর্যের আলো হঠাৎ কমে গেলে সেই পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া পরিমাপ করা সম্ভব হয়।
এ ধরনের গবেষণা শুধু গ্রহণের সময় কী ঘটে তা বোঝার জন্য নয়; পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল কীভাবে সূর্যের পরিবর্তনশীল কার্যকলাপের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে, সেটিও বোঝার সুযোগ তৈরি করে।
১৯১৯ সালের গ্রহণ বদলে দিয়েছিল বিজ্ঞানের ইতিহাস: সূর্যগ্রহণ যে বিজ্ঞানের ইতিহাসে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, তার সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ ১৯১৯ সালের পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ।
সেবার গ্রহণের সময় তোলা আলোকচিত্র ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করেছিলেন, সূর্যের মতো বিশাল বস্তুর মহাকর্ষ কীভাবে দূরবর্তী নক্ষত্রের আলোকে বাঁকিয়ে দিতে পারে। এই পর্যবেক্ষণ আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ফল দেয়। এর মাধ্যমে তত্ত্বটি ব্যাপক বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি পায়।
অর্থাৎ এক শতাব্দীরও বেশি আগে একটি সূর্যগ্রহণ যেমন মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দিয়েছিল, তেমনি বর্তমানের গ্রহণগুলোও সূর্যের কার্যপ্রণালি ও পৃথিবীর ওপর তার প্রভাব বোঝার নতুন দরজা খুলে দিচ্ছে।
সামনে আরো বড় গবেষণা: বিজ্ঞানীদের কাছে কোনো একটি গ্রহণের তথ্যই শেষ কথা নয়। একাধিক গ্রহণ থেকে পাওয়া তথ্য পাশাপাশি বিশ্লেষণ করলেই সূর্যের পরিবর্তনশীল আচরণ সম্পর্কে আরো নির্ভুল ধারণা পাওয়া সম্ভব।
এবারের গ্রহণের তথ্যও তাই পরবর্তী গবেষণায় ব্যবহার করা হবে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, সূর্যের করোনা, সৌরবায়ু এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ওপর গ্রহণের প্রভাব নিয়ে সংগৃহীত তথ্য ভবিষ্যতের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যাবে।
আগামী বছরও নতুন সূর্যগ্রহণের সুযোগ আসছে। ফলে এবারের পর্যবেক্ষণকে পরবর্তী গ্রহণের তথ্যের সঙ্গে তুলনা করে গবেষণাকে আরো বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে ১২ আগস্টের সূর্যগ্রহণ মানুষের জন্য ছিল বিরল এক আকাশের দৃশ্য, কিন্তু বিজ্ঞানীদের জন্য তা ছিল চলমান এক প্রাকৃতিক গবেষণাগার। চাঁদের কয়েক মিনিটের ছায়া তাই শুধু দিনের আলোকে বদলে দেয়নি; সূর্য কীভাবে কাজ করে এবং তার পরিবর্তন পৃথিবীকে কীভাবে প্রভাবিত করে-সেই পুরোনো প্রশ্নগুলোর নতুন উত্তর খোঁজার সুযোগও তৈরি করেছে।
সানা/ডিসি/আপ্র/১৬/৮/২০২৬