দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্পগোষ্ঠী এসকে গ্রুপের চেয়ারম্যান চে তায়ে-ওনকে বিবাহবিচ্ছেদের সম্পত্তি বণ্টন হিসেবে সাবেক স্ত্রী রোহ সো-ইয়ংকে ৯৪৪ বিলিয়ন কোরীয় ওন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে দেশটির আদালত। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এই অর্থের পরিমাণ দক্ষিণ কোরিয়ার বিবাহবিচ্ছেদ-সংক্রান্ত সম্পত্তি বণ্টনের মামলায় এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
তবে এই রায়ের বিরুদ্ধে আবারো দেশটির সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করেছেন চে তায়ে-ওন। তাঁর আইনজীবীরা শনিবার আপিল করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ফলে প্রায় এক দশক ধরে চলা এই আলোচিত দাম্পত্য বিরোধের আইনি লড়াই আরো দীর্ঘায়িত হলো।
৬৫ বছর বয়সী চে তায়ে-ওন দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী এসকে গ্রুপের চেয়ারম্যান। গ্রুপটির অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান এসকে হাইনিক্স বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় স্মৃতি চিপ নির্মাতাদের একটি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির প্রসারের কারণে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা ও বাজারমূল্য সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
যেভাবে শুরু হয় বিবাহবিচ্ছেদের মামলা: চে তায়ে-ওন ও রোহ সো-ইয়ং ১৯৮৮ সালের সেপ্টেম্বরে বিয়ে করেন। তাঁদের তিন সন্তান রয়েছে। প্রায় দুই দশক ধরে তাঁদের দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপোড়েন চলার পর ২০১৭ সালে চে তায়ে-ওন বিবাহবিচ্ছেদের জন্য আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেন। এর আগে ২০১৫ সালে তিনি প্রকাশ্যে জানান, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের মাধ্যমে তাঁর একটি সন্তান রয়েছে।
মামলার প্রথম ধাপে আদালত এসকে-র শেয়ারকে চে তায়ে-ওনের নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করে রোহ সো-ইয়ংকে ৬৬৫ কোটি ওন সম্পত্তি বণ্টন এবং ১০ কোটি ওন ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল।
২০২৪ সালে উচ্চ আদালত সেই অর্থের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে ১ দশমিক ৩৮ ট্রিলিয়ন ওন নির্ধারণ করে। ওই রায়ে এসকে গ্রুপের বিকাশে রোহ সো-ইয়ংয়ের অবদান এবং তাঁর বাবা, সাবেক প্রেসিডেন্ট রোহ তে-উয়ের কথিত আর্থিক সহায়তার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল।
পরে দক্ষিণ কোরিয়ার সর্বোচ্চ আদালত মামলাটি পুনর্বিবেচনার জন্য উচ্চ আদালতে ফেরত পাঠায়। সর্বোচ্চ আদালত জানায়, রোহ তে-উয়ের কথিত ৩০ বিলিয়ন ওনের গোপন অর্থ অবৈধ অর্থ হওয়ায় সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে সেটিকে রোহ সো-ইয়ংয়ের অবদান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ রোহ সো-ইয়ংয়ের: সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনার পর গত ২৪ জুলাই সিউল উচ্চ আদালতের পুনর্বিবেচনা মামলায় নতুন রায় দেওয়া হয়। এতে সম্পত্তি বণ্টনের অর্থ ৯৪৪ বিলিয়ন ওন নির্ধারণ করা হয়, যা আগের ১ দশমিক ৩৮ ট্রিলিয়ন ওনের চেয়ে অনেক কম। তবে এটিও দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসে সর্বোচ্চ বিবাহবিচ্ছেদজনিত সম্পত্তি বণ্টনের অর্থ।
আদালত চে তায়ে-ওনের মালিকানাধীন এসকে কোম্পানির শেয়ারকে সম্পত্তি বণ্টনের আওতায় রাখে। আদালতের বিবেচনায়, বৈবাহিক জীবনের সময়ে ওই সম্পদের মূল্য বৃদ্ধিতে রোহ সো-ইয়ংয়ের অবদান ছিল। ফলে যৌথ সম্পত্তির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রোহ সো-ইয়ংয়ের পাওনা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
তবে আদালত চে তায়ে-ওনের শেয়ার সরাসরি হস্তান্তরের পরিবর্তে নগদ অর্থে ৯৪৪ বিলিয়ন ওন পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে। এতে এসকে গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ কাঠামো অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
শেয়ারবাজারেও পড়তে পারে প্রভাব: এই বিপুল অর্থ পরিশোধের বিষয়টি এসকে গ্রুপের শেয়ারবাজারের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। চে তায়ে-ওনের হাতে থাকা এসকে কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে অর্থ জোগাড় করতে হলে তাঁর নিয়ন্ত্রণ ও বাজারে শেয়ারের দামে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে আদালতের বর্তমান রায়ে নগদ অর্থে অর্থ পরিশোধের নির্দেশ থাকায় চে তায়ে-ওনের এসকে কোম্পানির শেয়ার সরাসরি ভাগ করে দেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে না। তাঁর আইনজীবীরা জানিয়েছেন, মামলার পরবর্তী প্রক্রিয়ায় শেয়ারধারী ও এসকে গ্রুপের ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব যতটা সম্ভব কমানোর চেষ্টা করা হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির দ্রুত প্রসারের কারণে এসকে হাইনিক্সের ব্যবসায়িক মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে চে তায়ে-ওনের সম্পত্তি বণ্টনের মামলাটি শুধু দক্ষিণ কোরিয়ার একটি বহুল আলোচিত বিবাহবিচ্ছেদ মামলা নয়, দেশটির অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠীর মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চে তায়ে-ওনের নতুন আপিলের ফলে এখন মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য আবারো সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করতে হবে।
সানা/ডিসি/আপ্র/১৬/৮/২০২৬