নাটোরের গুরুদাসপুরে কালো জাদু বা কথিত ‘কুফরি কালাম’ করার অভিযোগ তুলে একই পরিবারের তিন নারীকে বাড়ি থেকে তুলে এনে মারধর, গলায় জুতার মালা পরিয়ে প্রকাশ্যে সড়কে ঘোরানো এবং পরে একটি কক্ষে আটকে রেখে ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকেল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে গুরুদাসপুর পৌরসভার গাড়িষাপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার দুটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তাঁদের বিরুদ্ধে কালো জাদু করার মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়। এরপর বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে মারধর করে গলায় জুতার মালা পরানো হয় এবং প্রকাশ্যে সড়কে ঘোরানো হয়। পরে ভবিষ্যতে এমন কাজ করবেন না-এমন অঙ্গীকার করিয়ে তাঁদের কাছ থেকে জোর করে ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। ঘটনার বিচার দাবি করেছেন তাঁরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রায় দেড় মিনিটের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তিন নারীর গলায় জুতার মালা পরিয়ে গাড়িষাপাড়া এলাকার একটি পাকা সড়কে হাঁটানো হচ্ছে। তাঁদের পেছনে উৎসুক মানুষের ভিড়। কয়েকজনকে হইহুল্লোড় করতেও দেখা যায়।
অন্য একটি ভিডিওতে তিন নারীকে একটি কক্ষে আটক অবস্থায় দেখা যায়। সেখানে ছাবলু নামের এক ব্যক্তি তাঁদের কাছ থেকে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিচ্ছেন। পাশে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে ভিডিও করছেন জিয়াউর রহমান বলে স্থানীয়রা শনাক্ত করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অভিযুক্ত ইয়ারুল সরদারের জামাতা রাতুলের সঙ্গে ভুক্তভোগী এক নারীর মেয়ের বিয়ের কথা হয়েছিল। পরে রাতুলের সঙ্গে ইয়ারুলের মেয়ে ঐশীর বিয়ে হয়। বিয়ের পর ঐশী অসুস্থ হয়ে পড়লে ইয়ারুলের পরিবার অভিযোগ তোলে, আগের বিয়ে না হওয়াকে কেন্দ্র করে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে ‘কালো জাদু’ করে ঐশীকে অসুস্থ করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, তান্ত্রিক ও কবিরাজের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারেন তাঁরা। এ নিয়ে প্রায় এক মাস আগে থানায় অভিযোগও করা হয়েছিল।
প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, কালো জাদু করার অভিযোগে শাস্তি দেওয়ার কথা বলে দুই মধ্যবয়সী নারী ও এক তরুণীকে বাড়ি থেকে তুলে আনা হয়। পরে তাঁদের গলায় জুতার মালা পরিয়ে সড়কে ঘোরানো এবং ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
অভিযুক্ত ইয়ারুল সরদার অবশ্য দাবি করেন, প্রায় ৫০ হাজার টাকা নিয়ে বিভিন্ন কবিরাজের মাধ্যমে তাঁর মেয়েকে ‘কুফরি কালাম’ ও ‘বান’ মারা হয়েছে। এতে তাঁর মেয়ের শারীরিক নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে তিন নারীকে জুতার মালা পরিয়ে প্রকাশ্যে ঘোরানোর অভিযোগের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অভিযুক্ত জিয়াউর রহমান বলেন, ‘এলাকাবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে নারীদের ধরে নিয়ে আসে। আমি ঘটনায় জড়িত নই। ভবিষ্যতে এমন কাজ না করার জন্য এলাকার মুরব্বিরা স্ট্যাম্পে মুচলেকা নিয়েছেন। আমি না থাকলে তাঁদের পিটুনি দেওয়া হতো।’
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জিয়াউর রহমান ও তাঁর ভাই ইয়ারুল সরদারের নেতৃত্বে তাঁদের হেনস্তা করা হয়েছে। তবে জিয়াউর রহমান এ ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও তাঁর সম্পৃক্ততা নিয়ে অভিযোগের কথা প্রকাশিত হয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান বলেন, তিন নারীকে জুতার মালা পরিয়ে হেনস্তা করার বিষয়ে থানায় কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুসংস্কার বা অপবাদকে কেন্দ্র করে কাউকে প্রকাশ্যে অপমান, নির্যাতন কিংবা শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ার কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেই। অভিযোগ সত্য বা মিথ্যা - তা নির্ধারণের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আদালতের। এই ঘটনার ক্ষেত্রেও ভুক্তভোগীদের অভিযোগের তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
সানা/আপ্র/৭/১০/২০২৬