ভারতকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি একরকম নয়। কোনো দেশে দেশটির প্রতি ব্যাপক ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে, আবার কোথাও নেতিবাচক মনোভাবই বেশি। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যেও এ পার্থক্য স্পষ্ট। সর্বশেষ জরিপে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যেও ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব কমে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৬ সালের বসন্তকালীন বৈশ্বিক মনোভাব জরিপে ৩৬টি দেশের ৪২ হাজার ১৫১ জন প্রাপ্তবয়স্ক অংশ নেন। জরিপটি ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ মে পর্যন্ত পরিচালিত হয়।
জরিপের সামগ্রিক ফলে দেখা যায়, ভারতকে নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি মোটের ওপর ইতিবাচক হলেও দেশভেদে পার্থক্য বেশ বড়। আফ্রিকার কয়েকটি দেশে ভারতের ভাবমূর্তি তুলনামূলক ভালো। ইউরোপের কয়েকটি দেশে ইতিবাচক মনোভাব থাকলেও উত্তর আমেরিকার কিছু দেশে তা কমেছে। প্রতিবেশীদের মধ্যে পাকিস্তানে ভারতের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব অত্যন্ত প্রবল, আর শ্রীলঙ্কায় চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত।
বাংলাদেশে ইতিবাচক মনোভাব কমেছে: বাংলাদেশের ৪২ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের কথা জানিয়েছেন। বিপরীতে ৫১ শতাংশের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক। অর্থাৎ, ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক মনোভাব ৯ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।
পিউ রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় বাংলাদেশে ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ১৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে। একই সময়ে মতামত দিতে অনিচ্ছুক মানুষের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে-২০২৪ সালের ২৪ শতাংশ থেকে এবার তা ৭ শতাংশে নেমেছে।
বাংলাদেশের এই প্রবণতা প্রতিবেশী দেশগুলোর চিত্রের সঙ্গে একটি উল্লেখযোগ্য পার্থক্য তৈরি করেছে। শ্রীলঙ্কায় ৭৯ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন, বিপরীতে নেতিবাচক ১১ শতাংশ। ২০২৪ সালে শ্রীলঙ্কায় ইতিবাচক মনোভাব ছিল ৬৫ শতাংশ।
পাকিস্তানে পরিস্থিতি আরো ভিন্ন। সেখানে মাত্র ৭ শতাংশ মানুষের ভারত সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা রয়েছে। বিপরীতে ৯১ শতাংশের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক।
উত্তর আমেরিকায় কমেছে ভারতের গ্রহণযোগ্যতা: যুক্তরাষ্ট্রে ৪৫ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক এবং ৫০ শতাংশ নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। পিউ রিসার্চের আগের তথ্যের সঙ্গে তুলনা করলে দেশটিতে ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের অবনতি স্পষ্ট।
কানাডায় ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে ৫১ শতাংশ মানুষের, আর নেতিবাচক ৪০ শতাংশের।
যুক্তরাষ্ট্রে বয়সভেদেও পার্থক্য দেখা যায়। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তুলনামূলক বেশি। বিপরীতে ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে তা ৪২ শতাংশ।
ইউরোপে ব্রিটেনে সবচেয়ে ইতিবাচক: ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যে ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব সবচেয়ে বেশি-৭১ শতাংশ। জার্মানিতে ৬৩ শতাংশ, ইতালিতে ৫৬ শতাংশ, সুইডেনে ৫৫ শতাংশ এবং ফ্রান্সে ৫০ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন।
নেদারল্যান্ডসে এ হার ৪৯ শতাংশ, হাঙ্গেরিতে ৪০ শতাংশ, গ্রিসে ৩৯ শতাংশ এবং পোল্যান্ড ও স্পেনে ৩৭ শতাংশ।
আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে মিশ্র চিত্র: ইসরায়েলে ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে ৬০ শতাংশ মানুষের; নেতিবাচক ২৯ শতাংশের। অন্যদিকে অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে মাত্র ১৮ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন।
তুরস্কে ভারতের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব সবচেয়ে প্রবল দেশগুলোর একটি। সেখানে ৭২ শতাংশ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক এবং মাত্র ১৫ শতাংশের ইতিবাচক।
আফ্রিকায় চিত্র তুলনামূলক ইতিবাচক। কেনিয়ায় ৭১ শতাংশ, ঘানায় ৫০ শতাংশ এবং নাইজেরিয়ায় ৪৭ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় অবশ্য ৪৬ শতাংশের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক, বিপরীতে ইতিবাচক ৩৮ শতাংশ।
এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায় অবস্থান: জাপান ও থাইল্যান্ডে ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে ৫৫ শতাংশ মানুষের। সিঙ্গাপুরে ৫১ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ৫০ শতাংশ, ফিলিপাইনে ৪৯ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় ৪৪ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ায় ৪১ শতাংশ।
লাতিন আমেরিকায় ব্রাজিলে ৩৭ শতাংশ, কলম্বিয়ায় ৩৬ শতাংশ, মেক্সিকোয় ৩০ শতাংশ, পেরুতে ২৯ শতাংশ, চিলিতে ২৫ শতাংশ এবং আর্জেন্টিনায় ২৪ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন।
পিউ রিসার্চের ২০২৫ সালের জরিপেও ২৪টি দেশে ভারতের প্রতি সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক মনোভাব দেখা গিয়েছিল; তখন মধ্যম মান হিসেবে ৪৭ শতাংশ মানুষ ভারতকে ইতিবাচকভাবে দেখেছিলেন। সব মিলিয়ে এবারের জরিপে ভারতের ভাবমূর্তিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য দেখা যায়-বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দেশটির প্রতি ইতিবাচক মনোভাব এখনো শক্তিশালী হলেও প্রতিবেশী বাংলাদেশে সেই ইতিবাচকতার জায়গাটি আগের তুলনায় সংকুচিত হয়েছে। আর দক্ষিণ এশিয়াতেই ভারতকে নিয়ে সবচেয়ে বড় মতপার্থক্যটি স্পষ্ট-শ্রীলঙ্কায় ব্যাপক ইতিবাচকতা, পাকিস্তানে প্রবল নেতিবাচকতা এবং বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক মনোভাব বেশি।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/১৬/৮/২০২৬