গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

মেনু

দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে

ডিমের বাজারে সিন্ডিকেট নয় তো?

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ২২:০৮ পিএম, ১৫ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ২২:৫৭ এএম ২০২৬
ডিমের বাজারে সিন্ডিকেট নয় তো?
ছবি

মাত্র কয়েক সপ্তাহে ডজনপ্রতি দাম বেড়েছে ৩০ টাকার বেশি

এক মাসের ব্যবধানে রাজধানীর বাজারে ফার্মের ডিমের দাম প্রতি ডজনে প্রায় ৩০ টাকা বেড়েছে। গত ১০ জুলাই যে ডিমের ডজন ছিল ১৩০ টাকা, এক সপ্তাহ পর তা ১৪০ টাকা, পরে ১৫০ টাকা হয়ে এখন ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক সপ্তাহে এক ডজন ডিমের দাম বেড়েছে প্রায় ৩০ টাকা। অথচ এই মূল্যবৃদ্ধির পুরোটা খামারির হাতে যাচ্ছে না। বরং খামার থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর পথে কয়েক ধাপে দাম বাড়ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত।

প্রশ্ন উঠছে-এই বাড়তি টাকার বড় অংশ যাচ্ছে কার পকেটে? বাজারে কি কেবল চাহিদা-সরবরাহের স্বাভাবিক নিয়মেই ডিমের দাম বাড়ছে, নাকি এর আড়ালে রয়েছে কোনো অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ?

রাজধানীর রায়ের বাজার কৃষি মার্কেট, মোহাম্মদপুর টাউন হল ও কারওয়ান বাজারে শুক্রবারের চিত্রে দেখা গেছে, প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায়। অথচ মানিকগঞ্জের এক খামারি জানিয়েছেন, খামার পর্যায়ে লাল ডিম বিক্রি হচ্ছে প্রতি পিস ১০ টাকা ৫০ পয়সা এবং সাদা ডিম ৯ টাকা ৫০ পয়সা দরে। অর্থাৎ খামার পর্যায়ে লাল ডিমের এক ডজনের দাম প্রায় ১২৬ টাকা।

অন্যদিকে আগারগাঁওয়ের বিএনপি বাজারের এক পাইকার জানিয়েছেন, তেজগাঁও আড়তে ১০০টি লাল ডিম কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ১৫০ টাকায়। অর্থাৎ ডজনপ্রতি প্রায় ১৩৮ টাকা। সেই ডিমই খুচরা বাজারে গিয়ে বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায়।

আরেক খুচরা বিক্রেতা জানিয়েছেন, তিনি ফার্ম থেকে ১০০টি ডিম কিনছেন ১ হাজার ২২০ টাকায়। সেখানে তাঁর প্রতি ডজন ডিমের ক্রয়মূল্যই দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৪৬ টাকা ৪০ পয়সা। এরপর পরিবহন, দোকান পরিচালনা, নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি ও মুনাফা যোগ করে ডিম বিক্রি করছেন ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায়।

অর্থাৎ একই পণ্যের ক্ষেত্রে খামারি, পাইকার ও খুচরা পর্যায়ের দামের মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান রয়েছে। কিন্তু এই ব্যবধানের কতটা যৌক্তিক ব্যবসায়িক খরচ আর কতটা অতিরিক্ত মুনাফা-সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

খামারির লাভ কোথায়? ডিমের দাম বাড়লেও খামারিরা বলছেন, তাঁরা সেই বাড়তি দামের সুফল পাচ্ছেন না। মানিকগঞ্জের খামারি শাহীন মিয়ার অভিযোগ, ঢাকার সাভার ও তেজগাঁওয়ের ব্যবসায়ীরাই অনেক সময় বাজারদর ঠিক করে দেন। তাঁদের দাবি, কয়েক দিন দাম কমিয়ে ডিম সংগ্রহ করে পরে আবার দাম বাড়িয়ে বাজারে বিক্রি করা হয়।

শাহীন মিয়ার ভাষায়, উৎপাদনের সব খরচ-মুরগির খাবার, ওষুধ, শ্রমিক ও খামার পরিচালনার ব্যয়-খামারিকেই বহন করতে হয়। অথচ বাজারে দাম বাড়লেও সেই বাড়তি অর্থের বড় অংশ খামারির হাতে পৌঁছায় না।

তবে ব্যবসায়ীদের বক্তব্য ভিন্ন। তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আমানত উল্লাহ মনে করেন, চাহিদা বাড়ার কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে ডিমের দাম বেড়েছে। তাঁর দাবি, উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলেও বর্ষায় শাকসবজির সরবরাহ ও মানে সমস্যা হওয়ায় মানুষ ডিমের দিকে বেশি ঝুঁকেছে। তাঁর মতে, বর্তমান দাম আর বাড়বে না; বরং কমতে পারে।

সিন্ডিকেটের অভিযোগ পুরোনো: ডিমের বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের উদ্যোগে ডিমের বাজারে অবৈধ নিয়ন্ত্রণ ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ নিয়ে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অংশগ্রহণে মতবিনিময় সভা হয়েছিল। ওই সভায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তেজগাঁও ও কাপ্তান বাজারের ডিম ব্যবসায়ী সমিতি ভোররাতে মুঠোফোনের খুদে বার্তার মাধ্যমে ডিমের মূল্য নির্ধারণ করে দেয়-এমন অভিযোগ তারা পেয়েছিল। বাজারে মূল্য নির্ধারণ করে তা খুদে বার্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও আলোচনায় আসে।

ওই সভার পর প্রতিযোগিতা কমিশন তেজগাঁও ও কাপ্তান বাজারের সংশ্লিষ্ট সমিতির বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর সিদ্ধান্ত নেয় এবং ডিমের বাজার নিয়ন্ত্রণ, মূল্য নির্ধারণ ও যোগসাজশের অভিযোগ অনুসন্ধানে দল গঠন করে।

বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়নি। প্রতিযোগিতা কমিশনের ২০২৬ সালের শুনানির তালিকাতেও ডিমের বাজার নিয়ে একাধিক মামলা রয়েছে। এর মধ্যে কাজী ফার্মসসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কমিশনের স্বপ্রণোদিত মামলা এবং বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন ও সংশ্লিষ্ট কয়েকটি পক্ষের বিরুদ্ধে ডিম-সংক্রান্ত মামলা রয়েছে। জুন ২০২৬-এ সি পি বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে ডিম-সংক্রান্ত একটি মামলার পুনর্বিবেচনা আবেদনও শুনানির তালিকায় ছিল।

অর্থাৎ ডিমের বাজারে প্রতিযোগিতা, মূল্য নির্ধারণ ও বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকারি পর্যায়ে উদ্বেগের নজির রয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাজারে ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকার দাম নির্ধারণের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট চক্র সরাসরি কাজ করছে-এমন চূড়ান্ত প্রমাণ এখনো সামনে আসেনি।

দাম বাড়ার ব্যাখ্যাও আছে: ডিমের বাজারে কেবল সিন্ডিকেটের অভিযোগ দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করাও ঠিক হবে না। চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে খামারিরা দীর্ঘদিন উৎপাদন খরচের নিচে ডিম বিক্রি করেছেন বলে জানিয়েছেন। জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনে খামারিদের সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রতি ডিমে উৎপাদন খরচ প্রায় ১০ টাকা হলেও ৬ টাকায় বিক্রি করার কারণে লোকসানের কথা বলা হয়েছিল।

জুলাইয়ের আরেক প্রতিবেদনে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে বছরের প্রথম সাত মাসের ছয় মাসেই লেয়ার খামারিরা উৎপাদন খরচের নিচে ডিম বিক্রি করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ বাজারে এখনকার মূল্যবৃদ্ধির একটি অংশ আগের দীর্ঘ লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।

এর পাশাপাশি টানা বৃষ্টি, পরিবহন ব্যয় ও সরবরাহের ওঠানামাও বিভিন্ন সময়ে ডিমের দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

কিন্তু এসব কারণ থাকলেও প্রশ্ন থেকে যায়-খামারি পর্যায়ে যে দামে ডিম বিক্রি হচ্ছে, সেখান থেকে রাজধানীর খুচরা বাজারে এসে কেন এত বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে?

তদন্তই দিতে পারে উত্তর: ডিম এমন একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, যার বাজারে মূল্য নির্ধারণের কাঠামো স্বচ্ছ না হলে উৎপাদক ও ভোক্তা-দুই পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হন। খামারি কম দামে বিক্রি করে লোকসান গুনবেন আর ভোক্তা বেশি দামে কিনবেন-মাঝের কোনো একটি স্তরে অস্বাভাবিক মুনাফা তৈরি হলে বাজারব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।

বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন নিজেই বলছে, বাজারে প্রতিযোগিতাবিরোধী কার্যক্রম, একচেটিয়া ব্যবসা কিংবা যোগসাজশ দেখা গেলে অভিযোগ ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তাই এখন প্রয়োজন ডিমের খামার থেকে আড়ত এবং আড়ত থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পুরো মূল্যশৃঙ্খলের হিসাব প্রকাশ্যে আনা। কোন স্তরে কত দামে ডিম কেনা হচ্ছে, কত খরচ যুক্ত হচ্ছে, কত মুনাফা রাখা হচ্ছে-তার স্বচ্ছ হিসাব হলেই বোঝা যাবে বর্তমান ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকার বাজারদর কতটা যৌক্তিক।

আর যদি দেখা যায়, স্বাভাবিক উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতির মধ্যেও একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে দাম নির্ধারণ, সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে বাজার প্রভাবিত করছে, তাহলে ‘ডিমের বাজারে সিন্ডিকেট নয় তো?’-এই প্রশ্ন আর শুধু ভোক্তার ক্ষোভ থাকবে না; সেটি হয়ে উঠবে রাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা আইন প্রয়োগের বিষয়।
সানা/আপ্র/১৫/৮/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

ভুয়া নিয়োগপত্রে চাকরি, বেতনও দিতো প্রতারক চক্র
১৫ আগস্ট ২০২৬

ভুয়া নিয়োগপত্রে চাকরি, বেতনও দিতো প্রতারক চক্র

মূল হোতা গ্রেফতার

ঢাকায় নিরাপত্তা ফাঁকি, দিল্লিতে নজরুলের ব্যাগে ৩১ গুলি
১৪ আগস্ট ২০২৬

ঢাকায় নিরাপত্তা ফাঁকি, দিল্লিতে নজরুলের ব্যাগে ৩১ গুলি

বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও বিমানবন্দরের কয়েক কর্মীর দায়িত্বে গাফিলতি

কাঁঠালের রসে বিস্কুট তৈরি করে শ্রীপুরে চমক
১৩ আগস্ট ২০২৬

কাঁঠালের রসে বিস্কুট তৈরি করে শ্রীপুরে চমক

বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিতে উদ্যোগ

তিন মণ ধান বেচে মেয়ের জন্য একটি ইলিশ কিনলেন কৃষক হাসান
১০ আগস্ট ২০২৬

তিন মণ ধান বেচে মেয়ের জন্য একটি ইলিশ কিনলেন কৃষক হাসান

রূপালি মাছের সোনালি দাম

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

লোডশেডিং নিয়ে বিএনপি সরকারের কড়া সমালোচনা নাহিদ ইসলামের

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে বিএনপি সরকারের কড়া সমালোচনা করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) এক সমাবেশে তিনি বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি ২০০১-২০০৬ সময়কার লোডশেডিং সংকটের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন নাহিদ ইসলাম সঠিক বলেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 21 ঘন্টা আগে