সংস্কৃতি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ ঘটায়-এই চেতনাকে সামনে রেখে নতুন প্রজন্মকে সংস্কৃতিচর্চায় সম্পৃক্ত করে জ্ঞানভিত্তিক, মানবিক ও সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম।
রোববার (১৬ আগস্ট) চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের সম্মেলন কক্ষে ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে দেশব্যাপী প্রাথমিক, কারিগরি ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আয়োজিত বিভাগীয় পর্যায়ের মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিকর্ম দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে নজরুলচর্চা ও সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ ঘটাতে ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি। বাংলা সাহিত্য, সংগীত, নাটক ও সংস্কৃতিতে তাঁর অবদান অপরিসীম। নানা কারণে নজরুলের বিশাল সৃষ্টিকর্মের অনেক কিছু এখনো যথাযথভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হয়নি। ‘নজরুল বর্ষের’ মূল লক্ষ্য হলো তাঁর সৃষ্টিকর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং এর মাধ্যমে সুস্থ, সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তোলা।
প্রতিমন্ত্রী জানান, গত ২৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ময়মনসিংহের ত্রিশালে কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ২৫ মে ২০২৬ থেকে ২৫ মে ২০২৭ পর্যন্ত ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা করেন। আগামী ৩১ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে এর কার্যক্রম শুরু হবে। প্রথম পর্যায়ে প্রাথমিক, কারিগরি ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে সংগীত, কবিতা, নাটক ও নৃত্য-এই চার বিষয়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায় থেকে শুরু হয়ে উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে পর্যায়ক্রমে প্রতিযোগিতা হবে। কোনো শিক্ষার্থীকে মনোনয়ন দিয়ে সরাসরি প্রতিযোগিতায় পাঠানো যাবে না। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্রতিযোগী নির্বাচন করতে হবে। এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের যথাযথ নজরদারির আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কয়েকজন বিজয়ী নির্বাচন করাই ‘নজরুল বর্ষের’ উদ্দেশ্য নয়। বিভিন্ন পর্যায়ে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদেরও সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখতে হবে। উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় থেকে পরবর্তী ধাপে বাদ পড়া অংশগ্রহণকারীদেরও শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। এর মাধ্যমে সারা দেশে সাংস্কৃতিক চর্চার শক্ত ভিত্তি তৈরি হবে।
তিনি জানান, পর্যায়ক্রমে প্রাথমিক, কারিগরি ও মাধ্যমিক শিক্ষা, মাদ্রাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে। সরকারি-বেসরকারি কলেজের পাশাপাশি মেডিকেল, কারিগরি, ভেটেরিনারি ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানও এর আওতায় আসবে।
চট্টগ্রাম বিভাগের জেলা প্রশাসকদের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিভাগীয় পর্যায়ে কর্মসূচির সার্বিক সমন্বয় করবেন বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকরা স্থানীয় বাস্তবতার আলোকে কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করবেন। উপজেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতার প্রয়োজনীয় ব্যয়ে সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে। তবে বিদ্যালয় পর্যায়ের ছোট পরিসরের আয়োজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় করতে হবে। আগামী ৩১ আগস্ট জেলা শহরগুলোতে সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে।
সংস্কৃতির ব্যাপক পরিসর তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সংস্কৃতি শুধু গান-বাজনা নয়; মানুষের মনন, চিন্তা, জীবনযাপন, সাহিত্য, বই পড়া, জাদুঘর, ঐতিহ্য, প্রত্নতত্ত্ব, পোশাক, খাবার, রান্না ও পিঠা উৎসব-সবকিছুই সংস্কৃতির অংশ। তরুণ প্রজন্মকে মাদক ও নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, দেশের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো কার্যকর ও যুগোপযোগী করতে সরকার কাজ করছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইন, বিধি ও প্রবিধান আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংগীত, বাদ্যযন্ত্র, নাটক ও যাত্রাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ প্রশিক্ষক ও শিল্পী তৈরিতে দেশব্যাপী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র ও সংগীতচর্চা পুনরুজ্জীবিত করতে প্রশিক্ষিত শিল্পী তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রত্যেক জেলা থেকে প্রতিভাবান শিল্পী নির্বাচন করে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন বাহিনীর নিজস্ব ব্যান্ড ও অর্কেস্ট্রাকে আরো সমৃদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিনের সভাপতিত্বে সভায় একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত ড. সুকোমল বড়ুয়া, চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে মতবিনিময় সভার আগে চট্টগ্রাম জিয়া স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী। পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, জিয়া স্মৃতি জাদুঘর একটি পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী ভবন। প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় ভবনটির মূল কাঠামো ও নির্মাণশৈলী অক্ষুণ্ন রেখে সংরক্ষণ ও পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, এটি শুধু একটি ভবন নয়, দেশের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই সাধারণভাবে ভবনটি মেরামত না করে এর মৌলিক কাঠামো ও ঐতিহ্যগত বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করে পুনর্গঠন করা হবে। পুরনো ঐতিহ্য ও স্থাপনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সে কারণে ভবনটি যেভাবে নির্মিত হয়েছিল, তার মৌলিক বৈশিষ্ট্য ও গঠনপ্রক্রিয়া যথাসম্ভব অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
সানা/আপ্র/১৬/৮/২০২৬