লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসে যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে টানা নয় দিন ভেসে থাকার পর অন্তত ১১ বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, নৌকার খাবার ও পানির মজুত ঝড়ে সাগরে ভেসে যাওয়ার পর তারা চরম সংকটে পড়েন। পরে নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেলে সাগরে ভাসতে থাকা অবস্থায় খাবার ও পানির অভাবে একে একে কয়েকজনের মৃত্যু হয়।
গত ৩ আগস্ট রাতে ৪২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা লিবিয়ার তাবারুক উপকূল থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করে। নৌকাটিতে থাকা ৪২ জনের মধ্যে ৩৮ জন বাংলাদেশি ছিলেন বলে জানা গেছে। যাত্রা শুরুর কিছুক্ষণ পরই নৌকাটি ঝড়ের কবলে পড়ে। এতে নৌকায় থাকা খাবার ও পানির মজুত সাগরে ভেসে যায়। এরপর কোনো খাবার ও পানি ছাড়াই যাত্রা অব্যাহত রাখতে বাধ্য হন তাঁরা।
গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। ফলে সেটি সাগরে ভাসতে থাকে। প্রায় নয় দিন পর বাতাস ও সাগরের স্রোতে নৌকাটি মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলের কাছে পৌঁছায়। পরে মিশরের নিরাপত্তা বাহিনী নৌকাটিতে থাকা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের উদ্ধার করে।
উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে ১৮ জনকে মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের শারীরিক অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে। মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাস হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জের আব্দুল হেকিমের ছেলে আব্দুল করিম ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর তাঁদের নৌকার ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায়। এরপর আর সামনে এগোনোর সুযোগ ছিল না। তাঁদের উদ্ধারে দালালের লোকজন বা অন্য কোনো সংস্থা এগিয়ে আসেনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, খাবার ও পানি না থাকায় চোখের সামনেই নয়জন বাংলাদেশি মারা যান। পরে আরো দুজনের মৃত্যু হয়। মরদেহগুলোতে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে সেগুলো সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হন তাঁরা। দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে জীবিতদের শরীরের বিভিন্ন স্থানেও পচন ধরেছে বলে জানান তিনি। দেশে ফিরে যাওয়ার আকুতিও জানিয়েছেন এই অভিবাসনপ্রত্যাশী।
মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে তাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। স্থানীয় পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৩০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে শারীরিকভাবে অসুস্থ ১৮ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদের প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছে। তবে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের জাতীয়তা সম্পর্কে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
আহত বাংলাদেশি নাগরিকদের চিকিৎসার অগ্রগতি ও সার্বিক পরিস্থিতি দূতাবাস পর্যবেক্ষণ করছে। তাঁরা সুস্থ হয়ে উঠলে মিশরের আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে আটক বাংলাদেশিদের ভ্রমণ অনুমতিপত্রের মাধ্যমে দ্রুত দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছে দূতাবাস।
লিবিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়ার এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা বাংলাদেশিদের জন্য নতুন নয়। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশিরা ইউরোপে পৌঁছাতে লিবিয়াভিত্তিক ভূমধ্যসাগরীয় পথ উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যবহার করেন। বিশেষ করে লিবিয়া থেকে গ্রিসের দিকে যাত্রা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে এবং দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার কারণে এ পথ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সানা/আপ্র/১৬/৮/২০২৬