২১ আগস্ট মশা দিবস। শুনতে কিছুটা অদ্ভুত হলেও দিবসটির উদ্দেশ্য মশাকে সম্মান জানানো নয়; বরং মশাবাহিত রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, মশার বিস্তার রোধে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা এবং ম্যালেরিয়ার জীবাণু সংক্রমণে মশার ভূমিকা আবিষ্কারের জন্য ব্রিটিশ চিকিৎসক স্যার রোনাল্ড রসকে স্মরণ করা।
আকারে অতি ক্ষুদ্র হলেও মশা পৃথিবীর অন্যতম প্রাণঘাতী প্রাণী। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, জিকা, ইয়েলো ফিভারসহ বিভিন্ন রোগের জীবাণু ছড়িয়ে দিতে পারে মশার কিছু প্রজাতি। ফলে সিংহ, বাঘ বা হাঙরের মতো বড় শিকারি প্রাণীর তুলনায়ও মানুষের জন্য মশাবাহিত রোগ অনেক বেশি প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে।
তবে বিস্ময়ের বিষয় হলো, পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাবের বহু আগেই মশার পূর্বপুরুষের অস্তিত্ব ছিল। আধুনিক মশা যে কিউলিসিডি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত, সেই পরিবারের জীবাশ্মের প্রমাণ প্রায় ১০ কোটি বছর আগের। অর্থাৎ মানুষের পৃথিবীতে আসার অনেক আগেই মশার বংশের বিচরণ শুরু হয়েছিল।
প্রাচীন মশার অস্তিত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া গেছে অ্যাম্বারে। গাছের রেজিনে আটকে যাওয়া ছোট প্রাণী ও পতঙ্গ দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে অ্যাম্বারে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমারের কাচিন অঞ্চলে পাওয়া ক্রিটেশিয়াস যুগের অ্যাম্বারে মশাসদৃশ প্রাচীন পতঙ্গের জীবাশ্ম বিজ্ঞানীদের প্রাচীন জীবজগত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কোটি বছর আগে থাকা মশা আর আজকের মশা একই রকম ছিল। দীর্ঘ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে তাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য, আচরণ ও জীবনযাপনে পরিবর্তন এসেছে। প্রাচীন মশা ও আধুনিক মশার মধ্যে পার্থক্য থাকলেও তাদের মধ্যে বিবর্তনীয় সম্পর্ক রয়েছে।
ডাইনোসরের যুগেও মশা ছিল কি না-এ প্রশ্নের উত্তর নিয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। প্রাচীন মশাসদৃশ পতঙ্গের জীবাশ্ম পাওয়া গেলেও ডাইনোসরের রক্ত খেয়ে মশা বেঁচে থাকত-এমন সরাসরি বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। জনপ্রিয় সিনেমা ও গল্পে ডাইনোসরের রক্তপায়ী মশার যে কল্পচিত্র দেখা যায়, তা বাস্তব বিজ্ঞানের সরল প্রতিফলন নয়।
মশার দীর্ঘকাল টিকে থাকার অন্যতম কারণ তাদের অসাধারণ অভিযোজন ক্ষমতা। পৃথিবীর জলবায়ু বহুবার বদলেছে, বরফযুগ এসেছে, উষ্ণ সময় এসেছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তন ঘটেছে; এমনকি প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে ডাইনোসরও বিলুপ্ত হয়েছে। কিন্তু মশার বংশ টিকে গেছে।
এর পেছনে তাদের জীবনচক্রও গুরুত্বপূর্ণ। প্রজননের জন্য বড় কোনো জলাশয়ের প্রয়োজন হয় না অনেক প্রজাতির মশার। ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ড্রেন কিংবা সামান্য জমে থাকা পানিও ডিম পাড়ার উপযুক্ত স্থান হয়ে উঠতে পারে। অনুকূল পরিবেশে ডিম থেকে লার্ভা, পিউপা হয়ে পূর্ণাঙ্গ মশায় পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়াও তুলনামূলক দ্রুত সম্পন্ন হয়।
আধুনিক মানুষের আবির্ভাব প্রায় ৩ লাখ বছর আগে। সেই তুলনায় মশার বংশের ইতিহাস কোটি কোটি বছরের। পৃথিবীর ইতিহাসকে যদি একটি বিশাল বই হিসেবে কল্পনা করা হয়, মানুষের অধ্যায় সেখানে একেবারে শেষের দিকের পাতায়; মশার গল্প শুরু হয়েছে তার বহু আগেই।
তবে মশা শুধু মানুষের জন্য রোগবাহী প্রাণী নয়। প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলেও তাদের ভূমিকা রয়েছে। মশার লার্ভা বিভিন্ন জলজ প্রাণীর খাদ্য এবং পূর্ণাঙ্গ মশাও নানা প্রাণীর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আবার কিছু প্রজাতির মশা ফুলের মধু ও উদ্ভিদের রস খায় এবং পরাগায়নেও ভূমিকা রাখে।
তাই মানুষের জন্য মশা নিঃসন্দেহে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হলেও প্রকৃতির বৃহত্তর ব্যবস্থায় তাদেরও একটি ভূমিকা রয়েছে। মানুষের আগেই পৃথিবীতে তাদের বিচরণ শুরু হয়েছিল-আর অভিযোজনের অসাধারণ ক্ষমতায় ক্ষুদ্র এই প্রাণীটি আজও টিকে আছে।
সানা/আপ্র/২১/৮/২০২৬