গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

‘বাংলার টেসলা’ বন্ধ নয়, চাই সুশৃঙ্খল রূপান্তর

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১২:৪৮ পিএম, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১৯:০৫ এএম ২০২৬
‘বাংলার টেসলা’ বন্ধ নয়, চাই সুশৃঙ্খল রূপান্তর
ছবি

ফাইল ছবি

রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার অবাধ বিস্তার এখন আর নিছক পরিবহন-সমস্যা নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনার গভীর দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। যে বাহন একসময় স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে স্বস্তি, সাশ্রয়ী ভাড়া এবং লাখো মানুষের জীবিকার পথ তৈরি করেছিল, নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তারে সেটিই এখন যানজট, দুর্ঘটনা, অনিয়ন্ত্রিত চলাচল ও অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের বড় উৎস। ফলে এর সমাধান হতে হবে নিষেধাজ্ঞানির্ভর নয়, বাস্তবতা ও জনস্বার্থের সমন্বয়ে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, দেশে কিংবা রাজধানীতে মোট কত ব্যাটারিচালিত রিকশা চলছে, তার নির্ভরযোগ্য সরকারি হিসাব নেই। বিভিন্ন হিসাবে সারা দেশে এ সংখ্যা ৫০ থেকে ৮০ লাখ এবং ঢাকায় ১৫ থেকে ২০ লাখ পর্যন্ত হতে পারে। এত বড় একটি পরিবহনখাতকে তথ্যের বাইরে রেখে কার্যকর নীতি প্রণয়ন সম্ভব নয়। তাই প্রথম কাজ হওয়া উচিত প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ, নিবন্ধন এবং প্রতিটি যানকে জবাবদিহির আওতায় আনা।

সরকারের প্রস্তাবিত নীতিমালায় রাজধানীর প্রধান সড়কে ই-রিকশা চলাচল বন্ধ করে অভ্যন্তরীণ সড়কে নিয়ন্ত্রিত চলাচলের পরিকল্পনা যথার্থ। আটটি জোনে বিভাজন, আলাদা রং, নিবন্ধন এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে জোন পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ-এসব উদ্যোগ কার্যকর হলে বিশৃঙ্খলা কমতে পারে। তবে নীতিমালা জারি করাই যথেষ্ট নয়; নিয়ম ভাঙলে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা, নিয়মিত নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

কারিগরি নিরাপত্তায় কোনো আপসের সুযোগ নেই। অনিয়ন্ত্রিতভাবে পুরোনো রিকশায় মোটর ও ব্যাটারি সংযোজন, নিম্নমানের যন্ত্রাংশ, দুর্বল ব্রেক ও অনিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি কারিগরি প্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়ন এবং ট্রাফিক বিভাগের ফিটনেস সনদ বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ তাই কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে অনুমোদনহীন কারখানা বন্ধ করে উৎপাদকদের নিবন্ধন ও মাননিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে হবে।

অবৈধ চার্জিংও বন্ধ করা জরুরি। বিদ্যুৎ চুরি রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি করছে; অনিরাপদ সংযোগ তৈরি করছে অগ্নিকাণ্ড ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি। বৈধ চার্জিংকেন্দ্র স্থাপনের পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক চার্জিংব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

তবে এই নীতির সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন চালকের জীবিকা। লাখো নিম্নআয়ের মানুষ এই পেশার ওপর নির্ভরশীল; অনেকে ভাড়ায় রিকশা চালান, কেউ ঋণ নিয়ে কিনেছেন। তাই হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তাঁদের জীবিকা কেড়ে নেওয়া যেমন মানবিক নয়, তেমনি অনিরাপদ যান চলতে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। ঝুঁকিপূর্ণ যান ধাপে ধাপে সরানোর পাশাপাশি চালকদের প্রশিক্ষণ, যোগ্যদের অনুমোদিত ব্যবস্থায় যুক্ত করা এবং বাদ পড়াদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে হবে।

ঢাকার যানজটের দায় অবশ্য এককভাবে ব্যাটারিচালিত রিকশার নয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ব্যক্তিগত গাড়ির আধিক্য, অবৈধ পার্কিং, সড়ক ও ফুটপাত দখল, দুর্বল গণপরিবহন এবং সিগন্যাল ব্যবস্থাপনার ঘাটতিও বড় কারণ। কিন্তু এসব বাস্তবতা অনিয়ন্ত্রিত রিকশা চলাচলের ছাড়পত্র হতে পারে না। বরং মেট্রোরেল, বাস ও অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে নির্দিষ্ট এলাকায় নিয়ন্ত্রিত রিকশাকে শেষ ধাপের যাতায়াতের অংশ করা যেতে পারে।

অতএব এখন অভিযাননির্ভর নয়, ব্যবস্থাপনানির্ভর নীতি প্রয়োজন। প্রকৃত সংখ্যা, নিবন্ধন, কারিগরি মান, চালকের প্রশিক্ষণ, গতি ও রুট নিয়ন্ত্রণ, বৈধ চার্জিং এবং উৎপাদন-সবকিছুকে একই কাঠামোয় আনতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত মূল্যায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

মোদ্দা কথা, ‘বাংলার টেসলা’ বন্ধ করাই সমাধান নয়; অনিয়ন্ত্রিত ‘বাংলার টেসলা’কে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থায় রূপান্তর করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত। মানুষের জীবিকা থাকবে, সাশ্রয়ী যাতায়াত থাকবে, কিন্তু তার বিনিময়ে জীবন ঝুঁকিতে পড়বে না। ঢাকার সড়ককে স্বস্তি, গতি ও নিরাপত্তায় ফেরাতে এখন কথার চেয়ে প্রয়োজন কার্যকর নীতি এবং তার কঠোর বাস্তবায়ন।
সানা/আপ্র/১/৯/২০২৬ 
 

সংশ্লিষ্ট খবর

ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার বাধ্যে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত জরুরি
১৫ অক্টোবর ২০২৬

ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার বাধ্যে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত জরুরি

ফুট ওভারব্রিজ বা আন্ডারপাস থাকা সত্ত্বেও সামান্য শারীরিক পরিশ্রম বা অলসতার অজুহাতে চলন্ত গাড়ির সামনে...

দারিদ্র্য বিমোচনের ঋণ যখন দারিদ্র্যেরই নতুন ফাঁদ
১৫ অক্টোবর ২০২৬

দারিদ্র্য বিমোচনের ঋণ যখন দারিদ্র্যেরই নতুন ফাঁদ

ক্ষুদ্রঋণের মূল দর্শন ছিল দরিদ্র মানুষের হাতে পুঁজি তুলে দিয়ে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টি, আত্ম...

নির্ধারিত দামে এলপিজি নিশ্চিত করুন, ভোক্তাকে জিম্মি করা বন্ধ হোক
১৪ অক্টোবর ২০২৬

নির্ধারিত দামে এলপিজি নিশ্চিত করুন, ভোক্তাকে জিম্মি করা বন্ধ হোক

জ্বালানি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য উপকরণ। অথচ সরকার নির্ধারিত দামেও যদি রান্নার গ্যাস না মেল...

প্রবাসীর প্রাণ, আঞ্চলিক শান্তি ও মানবিক নিরাপত্তার কঠিন পরীক্ষা
১৩ অক্টোবর ২০২৬

প্রবাসীর প্রাণ, আঞ্চলিক শান্তি ও মানবিক নিরাপত্তার কঠিন পরীক্ষা

প্রবাসে উপার্জিত অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে, অসংখ্য পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখে। অথচ সেই উপার্জ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পরিচয় যা-ই হোক, চাঁদাবাজ-দখলদারদের ছাড় নয়: ডিএমপি কমিশনার

চাঁদাবাজ, ভূমি দখলবাজ ও মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় বা অবস্থান বিবেচনা না করে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ। এসব অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানো যাবে না বলেও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে ডিএমপি সদর দপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সেপ্টেম্বর মাসের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় উপস্থিত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এসব নির্দেশনা দেন কমিশনার। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন- কমিশনার যে নির্দেশনা দিয়েছেন, পুলিশ সদস্যরা তা বাস্তবে তা করতে পারবেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 2 দিন আগে