যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক নগরের সরকারি প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে এক বছরের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির আগের স্তর থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ছয় লাখ শিক্ষার্থী এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সরকারি স্কুলব্যবস্থায় এটিকে এখন পর্যন্ত নেওয়া সবচেয়ে বিস্তৃত শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিষেধাজ্ঞা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিউইয়র্ক নগরের মেয়র জোহরান মামদানি ও স্কুল চ্যান্সেলর কামার স্যামুয়েলস বুধবার এ নীতিমালা ঘোষণা করেন। ২০২৬–২৭ শিক্ষাবর্ষজুড়ে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। নীতিমালার আওতায় শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহৃত সব ধরনের সৃজনশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সফটওয়্যার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সব শ্রেণিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত সহকারী চ্যাটবট ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা থাকবে।
মেয়র মামদানি বলেন, শিশুদের শেখা ও স্বাভাবিক বিকাশের জন্য শিক্ষক ও মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সহপাঠীদের সঙ্গে কাজ করা, শিক্ষকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং নিজের বুদ্ধি ও পরিশ্রমে কঠিন সমস্যার সমাধান করার মধ্য দিয়েই শিশুদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এসব মৌলিক শিক্ষণ-প্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না।
নতুন নীতিমালার ফলে শহরের বিদ্যালয়গুলোতে আগে ব্যবহৃত ৩৮টির বেশি অনুমোদিত শিক্ষামূলক ব্যবস্থার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সুবিধা বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় করা হবে। এসব প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের জন্য যথেষ্ট নিরাপদ, স্বচ্ছ ও শিক্ষার উপযোগী কি না, তা নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের তথ্যের নিরাপত্তা, শিক্ষাগত কার্যকারিতা, নৈতিকতা ও শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তবে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি। তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে সমালোচনামূলক ধারণা তৈরির জন্য বছরে দুবার ৪৫ মিনিটের পাঠ দেওয়া হবে। এসব পাঠে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কী এবং কী নয়, এর সম্ভাবনা, পক্ষপাত, ঝুঁকি, নৈতিকতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানে এর প্রভাব সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের শেখানো হবে।
এ ছাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য সীমিত পরিসরে পাঁচটি পরীক্ষামূলক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কর্মসূচি চালু করা হবে। প্রতিটি কর্মসূচি শিক্ষক-নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরিচালিত হবে এবং ব্যবহারের সময়ও সীমিত থাকবে। এসব কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীর নিজের চিন্তা ও যুক্তি প্রয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শিক্ষকের বা শিক্ষার্থীর বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থী, একাধিক ভাষায় শিক্ষাগ্রহণকারী এবং পেশাভিত্তিক প্রস্তুতি কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। শিক্ষকেরাও পাঠ পরিকল্পনা ও দাপ্তরিক কাজের মতো নির্দিষ্ট কাজে অনুমোদিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করতে পারবেন।
এর পাশাপাশি ছোট শিক্ষার্থীদের পর্দায় সময় কাটানোর ক্ষেত্রেও নতুন সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য দিনে সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট এবং ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ৪৫ মিনিটের একক পর্দা ব্যবহারের সীমা সুপারিশ করা হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে নিউইয়র্কের অবস্থান অবশ্য এবারই প্রথম কঠোর হয়নি। ২০২২ সালে চ্যাটজিপিটি চালুর পরপরই নগরের সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে এটির ব্যবহার সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। পরে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিতভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
নতুন নীতিমালার পেছনে মূল যুক্তি হলো—শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিনির্ভরতার আগে মৌলিক চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা, মানবিক যোগাযোগ ও স্বাধীনভাবে সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে তোলা। একই সঙ্গে আগামী এক বছর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শিক্ষাগত প্রভাব পর্যালোচনা করে ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণ করবে নগর কর্তৃপক্ষ। এ কারণে নিষেধাজ্ঞাটি স্থায়ী নয়; বরং এক বছরের পরীক্ষামূলক বিরতি হিসেবে নেওয়া হয়েছে।
নিউইয়র্কের এই সিদ্ধান্তের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য স্কুলব্যবস্থাতেও পড়তে পারে। লস অ্যাঞ্জেলেসসহ কয়েকটি বড় স্কুল ডিস্ট্রিক্ট ইতোমধ্যে শ্রেণিকক্ষে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে নিজেদের নীতিমালা পর্যালোচনা করছে। ফলে শিশুদের শিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা কতটা এবং কোন বয়সে হওয়া উচিত—এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সূত্র: রয়টার্স
সানা/আপ্র/৫/৯/২০২৬