যুক্তরাষ্ট্রে মানবদেহে জিনগতভাবে পরিবর্তিত শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড গড়েছেন চিকিৎসকেরা। টিম অ্যান্ড্রুজ নামের এক রোগীর শরীরে শূকরের কিডনিটি টানা ২৭১ দিন কার্যকর ছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে মানুষের শরীরে অন্য প্রজাতির প্রাণীর কোনো অঙ্গ এত দীর্ঘ সময় সচল থাকার এটিই দীর্ঘতম নজির।
যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের ম্যাস জেনারেল ব্রিঘাম হাসপাতালের চিকিৎসক দলের এ গবেষণার বিস্তারিত প্রতিবেদন চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের মতে, মানবদেহের উপযোগী কিডনি পাওয়া পর্যন্ত সাময়িক সমাধান বা সেতু হিসেবে শূকরের কিডনি ব্যবহারের সম্ভাবনার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ এই গবেষণা।
৬৬ বছর বয়সী টিম অ্যান্ড্রুজ টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন এবং তাঁর কিডনি বিকল হওয়ার শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তিনি নিয়মিত ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। চিকিৎসকেরা তাঁকে জানিয়েছিলেন, মানবদাতা থেকে কিডনি পেতে তাঁকে অন্তত সাত বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে। অথচ ডায়ালাইসিসনির্ভর রোগীদের ক্ষেত্রে গড়ে পাঁচ বছরের বেশি বেঁচে থাকা কঠিন বলে চিকিৎসকেরা উল্লেখ করেন।
এ অবস্থায় ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি অ্যান্ড্রুজের শরীরে জিনগতভাবে পরিবর্তিত শূকরের কিডনিটি প্রতিস্থাপন করা হয়। প্রতিস্থাপনের পরপরই কিডনিটি কার্যকরভাবে কাজ শুরু করে। টানা ২৭১ দিন সচল থাকার পর ওই বছরের অক্টোবরে কিছু জটিলতার কারণে কিডনিটি অপসারণ করা হয়। এরপর ৮২ দিন ডায়ালাইসিস নেওয়ার পর তিনি একজন মানবদাতার কিডনি পান। বর্তমানে সেই কিডনিটি তাঁর শরীরে ভালোভাবে কাজ করছে।
অন্য প্রাণীর অঙ্গ মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপনের এ চিকিৎসাপদ্ধতিকে জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন বলা হয়। মানুষের শরীরে অন্য প্রাণীর অঙ্গ প্রতিস্থাপন করলে অনাক্রম্যতন্ত্র সাধারণত সেটিকে বিদেশি বস্তু হিসেবে শনাক্ত করে দ্রুত আক্রমণ করে। এতে অঙ্গটির রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অঙ্গটি দ্রুত অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।
এই প্রতিরোধ কাটাতে গবেষকেরা ইউকাটান প্রজাতির খুদে শূকরের জিনে ৬৯টি পরিবর্তন আনেন। এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে শূকরের কোষে থাকা মানুষের অনাক্রম্যতন্ত্রের কাছে শনাক্তযোগ্য কিছু বৈশিষ্ট্য সরিয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি মানুষের কিছু জিন যুক্ত করে অঙ্গটিকে মানবদেহের কাছে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করা হয়। শূকরের জিনে থাকা ভাইরাসও নিষ্ক্রিয় করা হয়, যাতে মানুষের শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমে।
তবে প্রতিস্থাপনের প্রায় ছয় মাস পর অ্যান্ড্রুজের শরীরে থাকা শূকরের কিডনিটির রক্তনালিতে ক্ষতির লক্ষণ দেখা দেয় এবং সেখানে প্রদাহ সৃষ্টি হয়। তাঁর অনাক্রম্যতন্ত্রের অ্যান্টিবডির সরাসরি আক্রমণের স্পষ্ট প্রমাণ না মিললেও একপর্যায়ে কিডনিটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। পরে চিকিৎসকেরা সেটি অপসারণের সিদ্ধান্ত নেন।
ম্যাস জেনারেল ব্রিঘামের প্রতিস্থাপনবিজ্ঞান কেন্দ্রের চিকিৎসক লিওনার্দো রিয়ালা বলেন, বিশ্বজুড়ে অঙ্গের তীব্র সংকটের মধ্যে জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন আশার আলো দেখাচ্ছে। তাঁর মতে, গবেষণার ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে—ভবিষ্যতে ডায়ালাইসিসের ওপর দীর্ঘদিন নির্ভর না করে শূকরের কিডনি ব্যবহার করে রোগীদের জীবন রক্ষার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রেই বর্তমানে প্রায় এক লাখ মানুষ নতুন কিডনির অপেক্ষায় রয়েছেন। সেখানে বছরে প্রায় ২৫ হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় দাতার কিডনির ঘাটতি ব্যাপক। এই বাস্তবতায় অ্যান্ড্রুজের শরীরে শূকরের কিডনি ২৭১ দিন কার্যকর থাকার ঘটনা মানবদেহে প্রাণীর অঙ্গ প্রতিস্থাপনের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সূত্র: বিবিসি
সানা/আপ্র/৪/৯/২০২৬