নেপালে ভয়াবহ হিমবাহ ও পাহাড়ধসে সৃষ্ট ঢলের নয় দিন পর গভীর সুড়ঙ্গ থেকে দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। গত ২৬ আগস্ট চীন-নেপাল সীমান্তের পাহাড়ে হিমবাহ ও পাথরধসের পর তাঁদের জীবিত উদ্ধারের ঘটনাকে ‘অলৌকিক’ বলে অভিহিত করছেন স্বজন ও উদ্ধারকারীরা। খবর এএফপি ও বিবিসি।
উদ্ধার হওয়া দুই শ্রমিক হলেন ৪৫ বছর বয়সী কবির মহারাজন ও ৩০ বছর বয়সী সঞ্জয় শাহ। তাঁরা দুজনই নেপালের নাগরিক এবং ত্রিশূলী ৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ছিলেন। কবির ছিলেন যান্ত্রিক বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক এবং সঞ্জয় একই বিভাগের ফোরম্যান।
দুর্যোগের পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন তাঁরা। শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) উদ্ধারকারীরা তাঁদের সুড়ঙ্গ থেকে জীবিত অবস্থায় বের করে আনেন। পরে চিকিৎসার জন্য দুজনকেই কাঠমান্ডুতে নেওয়া হয়।
কবির মহারাজনের স্ত্রী হীরাশোভা বিবিসি নেপালিকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বামীর উদ্ধারের ছবি দেখে তিনি অত্যন্ত খুশি হয়েছেন। স্বামীকে কাঠমান্ডুর সেনা হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে জেনে তিনি দ্রুত হাসপাতালের দিকে রওনা হন।
তিনি বলেন, প্রায় ১০ দিন তাঁদের পরিবার ঠিকমতো খেতে বা পান করতে পারেনি। তাঁরা ভীষণ ভয় পেয়েছিলেন। স্বামীকে জীবিত উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর পরিবারের সবাই আনন্দিত হয়েছেন, এমনকি আনন্দে কেঁদেছেন।
কবিরের শ্যালিকা লক্ষ্মী নাইনি এএফপিকে বলেন, ‘এটা অলৌকিক ঘটনা! আমি খুব খুশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানতে পেরেছি, তিনি বেঁচে আছেন। আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না।’
কবিরের আরেক স্বজন ৪৫ বছর বয়সী শ্যাম মহারাজন বলেন, তিনি কেমন অনুভব করছেন, তা প্রকাশ করার মতো কোনো শব্দ তাঁর নেই। কবিরের ভাই আমির মহারাজন বলেন, তিনি অত্যন্ত খুশি; তাঁর বুকটা যেন হালকা হয়ে গেছে।
আশঙ্কাজনক কবির, চিকিৎসাধীন সঞ্জয়
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া দুই শ্রমিকের হাত ও পায়ে আঘাত রয়েছে। সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বের হওয়ার সময় তাঁরা এসব আঘাত পেয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, কবির মহারাজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁকে কাঠমান্ডুর সেনা হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। সঞ্জয় শাহকেও একই হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা দেওয়া হবে।
দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী বিরাজ ভক্ত শ্রেষ্ঠ এক বিবৃতিতে বলেছেন, যতক্ষণ শ্বাস আছে, ততক্ষণ আশা আছে। ক্ষতিগ্রস্ত সব সুড়ঙ্গে উদ্ধার অভিযান চলছে এবং সবাইকে প্রচেষ্টা ও প্রার্থনা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
নিখোঁজ পাঁচ হাজারের বেশি
২৬ আগস্ট চীন-নেপাল সীমান্তের একটি পাহাড়ে বিশাল হিমবাহ ও পাথরের ধসের পর কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত ওই অঞ্চল দিয়ে বয়ে যায়। এতে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি হয়।
দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৩০১ জন নিহত এবং ৫ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে অন্তত ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।
দুর্যোগের পর নেপাল সরকার ধারণা করেছিল, বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে শতাধিক শ্রমিক জীবিত থাকতে পারেন। এরপর থেকে তাঁদের সন্ধানে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান শুরু হয়।
ত্রিশূলী ৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বিভিন্ন স্থানে এখনো তল্লাশি চলছে। ভারত, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় নেপালের উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে থাকা এবং জীবিত থাকার আশঙ্কা করা শ্রমিকদের সন্ধান করছেন।
নয় দিন পর দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ ও গভীর সুড়ঙ্গের ভেতরে আরো কেউ জীবিত থাকতে পারেন—এমন সম্ভাবনা সামনে রেখেই উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সানা/আপ্র/৪/৯/২০২৬