ঐতিহ্যবাহী লেটোগান ও কবিগানের সুর-ছন্দে ফুটে উঠল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লোকায়ত জীবন, কৈশোরের শিল্পচর্চা ও বিদ্রোহী চেতনার শেকড়। নজরুল বর্ষ উদযাপনের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত বিশেষ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ‘নজরুলের লেটোগান ও কবিগান’-এ উঠে আসে কবির সৃষ্টির এক অনালোচিত অথচ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে লেটোগান ও কবিগানের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে নজরুলের কৈশোরের লেটো গানের চর্চা, লোকঐতিহ্যের প্রভাব এবং তাঁর সৃষ্টিশীল ও বিদ্রোহী সত্তার উৎস অনুসন্ধানের প্রয়াস দেখা যায়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ‘কাজী নজরুল ইসলামের লেটোগান ও কবিগান: লোকঐতিহ্য, সৃজনশীলতা ও বিদ্রোহী চেতনার উৎসসন্ধান’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সরকারি সংগীত কলেজের লোকসংগীত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. কমল খালিদ।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ (রেজাউদ্দিন স্টালিন)। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান তানি। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি বিভাগের পরিচালক মেহবাজীন রহমান।
সভাপতির বক্তব্যে কবি শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ বলেন, নজরুলের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় তাঁর কৈশোর, যখন তিনি লেটো গানের দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু লেটোগান কী এবং কীভাবে এর পরিবেশনা হতো, তা এখনো অনেকের কাছে অজানা।
তিনি বলেন, নজরুলের লেটোগানের মধ্যে নাটক, বক্তব্য ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশনার বৈশিষ্ট্য ছিল। একটি দল বক্তব্য উপস্থাপন করলে অন্য দল গানে ও কথায় তার জবাব দিত। এমন পরিবেশনায় অংশ নিতে হলে মহাভারত, বেদ, পবিত্র কোরআনসহ বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন হতো।
তাঁর মতে, ছোটবেলা থেকেই লেটো গানের সঙ্গে যুক্ত থাকার ফলে নজরুলের জীবনাচরণে কবিতা ও সংগীত গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে দ্রুত ও তাৎক্ষণিকভাবে গান রচনার যে অসাধারণ সক্ষমতা তিনি অর্জন করেন, তার পেছনেও লেটো গানের অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে পরিবেশিত হয় নজরুলের লেটোগান ‘অন্ধরাজা’। এর পরিচালনা ও রূপায়ণ করেন ড. কমল খালিদ। সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন সায়মা আহমেদ লিজা। লেটোগান পরিবেশন করে ‘নিমশা লেটোদল’ ও ‘মেদেনীপুর লেটোদল’।
এরপর পরিবেশিত হয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘কবির লড়াই’। এর পরিচালনা ও রূপায়ণ করেন জীবন চৌধুরী। কবিয়াল জীবনউড়ের সঙ্গে গানে গানে লড়াইয়ে অংশ নেন কবিয়াল গুমানী বাবু।
পরিবেশনায় ছিলেন জীবন চৌধুরী-গুমানী বাবু, বাবুল হোসাইন-জীবনউড়ে এবং মামুন হোসাইন-সূত্রধর (কয়ালী)। দোহার হিসেবে ছিলেন শান, সৈয়দ মাসুমুর রহমান, জয়ন্ত বিকাশ দাস, মাহমুদা আক্তার রুপা, আরবী ইসলাম স্বর্ণা, জান্নাত আরা শ্যামলী, অনন্যা রায় ও নারানয় দেব।
বাদ্যযন্ত্রে তবলায় ছিলেন তুষার কান্তি সরকার, বাঁশিতে মো. নয়ন, ঢোলে আকাশ কবির এবং খঞ্জরি ও মন্দিরায় মো. সোহেল মিয়া।
লোকসংস্কৃতির প্রাণস্পন্দন ও নজরুলের বিদ্রোহী চেতনার এই সম্মিলন যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিলো—নজরুলকে জানতে হলে শুধু তাঁর কবিতা ও গানের পাতা নয়, ফিরে তাকাতে হয় সেই মাটির কাছেও, যেখান থেকে তাঁর সৃষ্টির প্রথম সুর উঠে এসেছিল।
সানা/আপ্র/৪/৯/২০২৬