মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে কলকাতার টালিগঞ্জে শুরু হয়েছে চার দিনের বর্ণাঢ্য উৎসব। শোভাযাত্রা, শ্রদ্ধা নিবেদন, স্মরণসভা ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হচ্ছে বাংলা চলচ্চিত্রের এই কিংবদন্তি অভিনেতার শততম জন্মবার্ষিকী।
আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকালে মহানায়কের মূর্তিতে ফুলের মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক।
স্মরণসভায় চলচ্চিত্র অঙ্গনের প্রবীণ ও নবীন শিল্পীদের পাশাপাশি রাজ্য সরকারের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন। সকালে একই গাড়িতে অনুষ্ঠানে আসেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, দীপক অধিকারী দেব ও জিৎ।
অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের পোশাকেও ছিল উত্তম-সুচিত্রা জুটির স্মৃতি। ঘিয়ে ও মেরুন রঙের শাড়ির আঁচলে ফুটিয়ে তোলা হয় ‘সপ্তপদী’ সিনেমার ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গানের দৃশ্য। শাড়ির পাড়জুড়ে ছিল মহানায়কের অবয়ব। অনুষ্ঠানে সেই আঁচল টেনে এর নকশা খুঁটিয়ে দেখেন দেব ও প্রসেনজিৎ।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে আয়োজিত এ উৎসবে প্রবীণ-নবীন শিল্পীদের অংশগ্রহণে বর্ণাঢ্য পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কলকাতার নিউ টাউনে ‘উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টার’-এর ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে চলছে উত্তম কুমার অভিনীত সিনেমার প্রদর্শনী।
ফ্লপ মাস্টার থেকে মহানায়ক
১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতার আহিরীটোলায় মামাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন উত্তম কুমার। বাবা-মায়ের দেওয়া নাম ছিল অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়।
১৯৪৮ সালে নীতিন বসু পরিচালিত ‘দৃষ্টিদান’ সিনেমায় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তাঁর। তবে প্রথম সিনেমাটি দর্শক-ব্যবসায় সাড়া ফেলতে পারেনি। এমনকি পোস্টারে নামও স্থান পায়নি তাঁর। নির্ধারিত ২৭ টাকা পারিশ্রমিকের অর্ধেক—সাড়ে ১৩ টাকা দেওয়া হয়েছিল তাঁকে।
১৯৪৮ থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে পরপর কয়েকটি সিনেমা ব্যর্থ হওয়ায় চলচ্চিত্র অঙ্গনে তাঁর নামের সঙ্গে জুড়ে যায় ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ তকমা। ১৯৫২ সালে নির্মল দের ‘বসু পরিবার’ সিনেমা দিয়ে সেই পরিস্থিতির মোড় ঘুরতে শুরু করে। স্টুডিওর এক কোণে আনমনে গান গাইতে থাকা উত্তমের অভিব্যক্তিতে মুগ্ধ হয়েই পরিচালক তাঁকে সিনেমাটিতে সুযোগ দিয়েছিলেন।
এরপর ১৯৫৩ সালে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ সিনেমায় প্রথমবার সুচিত্রা সেনের সঙ্গে জুটি বাঁধেন উত্তম কুমার। সুচিত্রার চরিত্রটির জন্য প্রথম পছন্দ ছিলেন সে সময়ের খ্যাতনামা শিল্পী মালা সিনহা। তিনি প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলে সুচিত্রা সেনকে নেওয়া হয়। সেখান থেকেই শুরু হয় বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় রোমান্টিক জুটির যাত্রা। ১৯৫৪ সালের ‘অগ্নিপরীক্ষা’ সিনেমার মাধ্যমে উত্তম-সুচিত্রা জুটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
উত্তম কুমারের বাবা সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় কলকাতার ঐতিহাসিক ‘মেট্রো সিনেমা’ প্রেক্ষাগৃহের প্রধান প্রক্ষেপণকর্মী ছিলেন। দীর্ঘদিন শুধু ইংরেজি সিনেমা প্রদর্শনের জন্য পরিচিত এই প্রেক্ষাগৃহে ১৯৫৭ সালে প্রথমবার বাংলা সিনেমা হিসেবে উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত ‘চন্দ্রনাথ’ প্রদর্শিত হয়।
সাফল্যের আড়ালেও ছিল সংগ্রাম
চলচ্চিত্রে সাফল্যের পর ১৯৬৭ সালে নিজের প্রযোজনায় ‘অগ্নিপরীক্ষা’র হিন্দি সংস্করণ ‘ছোটী সী মুলাকাত’ নির্মাণ করে বড় ধরনের ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়েন উত্তম কুমার। বিশাল দেনা পরিশোধের চাপ ও অতিরিক্ত কাজের কারণে সত্যজিৎ রায়ের ‘চিড়িয়াখানা’ সিনেমার শুটিং সেটে প্রথমবার হৃদরোগে আক্রান্ত হন তিনি।
শাস্ত্রীয় সংগীতে দখল থাকলেও চলচ্চিত্রে নিজের কণ্ঠে গান গাইতে না পারার একটি প্রচ্ছন্ন আক্ষেপ ছিল তাঁর। জীবনের শেষভাগে প্রখ্যাত পরিচালক তপন সিংহের ‘বাঞ্ছারামের বাগান’ সিনেমার একটি চরিত্র নিয়ে আইনি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়াও ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম তিক্ত অভিজ্ঞতা।
সব চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান আইকন হয়ে আছেন উত্তম কুমার। মৃত্যুর বহু বছর পরও তাঁর অভিনয়শৈলী ও পর্দার উপস্থিতি দুই বাংলার চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে অমলিন।
সানা/আপ্র/৪/৯/২০২৬