সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ও আরাধ্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি শুভ জন্মাষ্টমী আজ। শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, ভক্তি ও আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে দিনটি উদ্যাপন করছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। এ উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটি।
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে দ্বাপর যুগে মথুরার কারাগারে দেবকী ও বাসুদেবের সন্তান হিসেবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে। অন্যায়, অধর্ম ও অশুভ শক্তির বিনাশ এবং সত্য, ন্যায়, মানবতা ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠাই তাঁর আবির্ভাবের মূল তাৎপর্য হিসেবে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন। এই বিশ্বাস থেকেই যুগে যুগে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের প্রতীক হিসেবে শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি জন্মাষ্টমী হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণীতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে শ্রীকৃষ্ণকে পরোপকারী, দক্ষ রাজনীতিক ও সমাজ সংস্কারক হিসেবে উল্লেখ করে সত্য, ন্যায়, মানবতা ও কল্যাণের আদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ধর্মীয় কারণে সংঘাত, হানাহানি ও বিভেদ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে ধৈর্য ও সহনশীলতার মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণের দর্শন থেকে শিক্ষা নিয়ে অসাম্প্রদায়িক ও ঐক্যবদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাণীতে বিশ্বের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বলেছেন, শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা সমাজে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও সুদৃঢ় করবে। সম্প্রীতির পরিবেশ কেউ যাতে বিনষ্ট করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি সমাজে শৃঙ্খলা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে প্রত্যেককে সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন মন্দির, মঠ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পূজা-অর্চনা, গীতাযজ্ঞ, হরিনাম সংকীর্তন, ভজন, আরতি, প্রসাদ বিতরণ, ধর্মীয় আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনেক ভক্ত উপবাস থেকে শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা করছেন।
রাজধানীতে কেন্দ্রীয় জন্মাষ্টমী মিছিল
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে দুই দিনব্যাপী কেন্দ্রীয় জন্মাষ্টমী উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। আজ সকাল ৮টায় দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় গীতাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের শংকর মঠ ও মিশন এ গীতাযজ্ঞ পরিচালনা করছে।
বেলা ৩টায় ঢাকেশ্বরী মন্দিরসংলগ্ন পলাশীর মোড় থেকে কেন্দ্রীয় জন্মাষ্টমীর বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা শুরু হবে। শোভাযাত্রার উদ্বোধন করবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও নৃগোষ্ঠী বিষয়ক বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালামসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন। মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন।
শোভাযাত্রাটি জগন্নাথ হল, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, দোয়েল চত্বর, হাইকোর্ট, বঙ্গবাজার, গোলাপশাহ মাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে গিয়ে শেষ হবে। ঢাকা মহানগর পুলিশ শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা ও যান চলাচলে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিয়েছে। রাতে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে শ্রীকৃষ্ণপূজা অনুষ্ঠিত হবে।
ইসকনের তিন দিনের কর্মসূচি
আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘও জন্মাষ্টমী উপলক্ষে ৩ থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন দিনের কর্মসূচি নিয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ, ভজন-কীর্তন, ভোগ আরতি, মহাপ্রসাদ বিতরণ, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় নাটক ও কীর্তন মেলা। ঢাকার স্বামীবাগ মন্দিরে আজ সকাল ৮টায় শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পাঠের মধ্য দিয়ে তাদের কর্মসূচির প্রধান আয়োজন শুরু হয়। সন্ধ্যায় আরতি ও শ্রীকৃষ্ণলীলামৃত এবং রাতে মহাভিষেকের আয়োজন রয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকার রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনেও সকালে গীতাপাঠের মধ্য দিয়ে জন্মাষ্টমীর আয়োজন শুরু হয়েছে। পরে ভজন ও প্রসাদ বিতরণ এবং সন্ধ্যায় শ্রীকৃষ্ণপূজা ও শ্যামনাম সংকীর্তনের আয়োজন করা হয়েছে।
সারা দেশে বিশেষ নিরাপত্তা
জন্মাষ্টমী নির্বিঘ্নে উদ্যাপন নিশ্চিত করতে সারা দেশে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে র্যাব। মন্দির, পূজামণ্ডপ, অনুষ্ঠানস্থল ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত টহল জোরদারের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি পর্যালোচনা করে প্রতিটি ব্যাটালিয়ন এলাকাভিত্তিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা করেছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত সদস্য ও সংরক্ষিত বাহিনী প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
উৎসবকে কেন্দ্র করে কোনো চরমপন্থী গোষ্ঠী, নিষিদ্ধ সংগঠন বা অন্য কোনো মহল যাতে নাশকতা কিংবা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য তাদের গতিবিধির ওপর নজরদারি রাখা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, ধর্মীয় নেতা, পুরোহিত ও বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তায়ও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রার সামনে, পেছনে ও দুই পাশে র্যাব সদস্য মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারী গুজব, ভুল তথ্য, অপপ্রচার, উসকানিমূলক পোস্ট, মন্তব্য ও ছবি শনাক্তে সাইবার নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
র্যাব দেশবাসীকে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশে জন্মাষ্টমী উদ্যাপনের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে কোনো সন্দেহজনক ব্যক্তি, বস্তু বা কার্যক্রম চোখে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে নিকটস্থ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর অনুরোধ জানিয়েছে।
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলে বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হচ্ছে।
সানা/আপ্র/৪/৯/২০২৬