বাংলা গান ও চলচ্চিত্রের আকাশে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর কলমে লেখা গান ছুঁয়েছে মানুষের হৃদয়, তাঁর সৃষ্টিতে উচ্চারিত হয়েছে দেশ, প্রেম, বিরহ ও জীবনের নানা অনুভব। খ্যাতিমান গীতিকার, চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক গাজী মাজহারুল আনোয়ারের প্রয়াণ দিবস আজ। ২০২২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ৭৯ বছর বয়সে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান বাংলা সংস্কৃতির এই কিংবদন্তি। মৃত্যুর চার বছর পরও তাঁর সৃষ্টি বাঙালির স্মৃতি ও সংগীতের ভুবনে সমানভাবে দীপ্তিমান।
তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বিশেষ আয়োজন করেছে আর্টিস্ট ক্লাব। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত আর্টিস্ট ক্লাবের লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত হবে ‘আইকনিক টিউজডে’ শীর্ষক স্মরণ অনুষ্ঠান। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় শুরু হবে আয়োজন। এতে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের বর্ণাঢ্য জীবন ও কর্ম নিয়ে স্মৃতিচারণ করবেন তাঁর সহধর্মিণী জোহরা গাজী এবং পুত্র সরফরাজ আনোয়ার উপল। স্মরণ আলোচনা ছাড়াও থাকবে তাঁর কালজয়ী গান নিয়ে বিশেষ সংগীত পরিবেশনা।
১৯৪৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে জন্ম গাজী মাজহারুল আনোয়ারের। স্কুলজীবনেই দেয়াল পত্রিকায় কবিতা লিখতেন। তবে কবিতা থেকে গানের জগতে তাঁর প্রবেশের গল্পটিও ছিল বেশ নাটকীয়।
মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় একটি নাটকের প্রয়োজনে প্রখ্যাত গীতিকার আবু হেনা মোস্তফা কামালের গান লেখার কথা ছিল। কিন্তু সময়স্বল্পতার কারণে তিনি গানটি লিখতে পারেননি। পরে নাটকের পরিচালকের অনুরোধে তরুণ গাজী মাজহারুল আনোয়ারই প্রথমবারের মতো গান লেখেন। সেই গান দিয়েই শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ ও বর্ণিল সৃষ্টিযাত্রা।
১৯৬৪ সালে রেডিও পাকিস্তানের মাধ্যমে নিয়মিত গান লেখা শুরু করেন তিনি। পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকেই গান ও নাটক রচনায় যুক্ত ছিলেন। চলচ্চিত্রের জন্য প্রথম গান লেখেন ১৯৬৭ সালে ‘আয়না ও অবশিষ্ট’ ছবিতে। এরপর গল্প, চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচনাতেও নিজের সৃষ্টিশীল দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন।
১৯৮২ সালে ‘নান্টু ঘটক’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনে মোট ৪১টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন তিনি। গীতিকার, চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক—সৃজনশীলতার প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজের আলাদা পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন এই বহুমাত্রিক শিল্পী।
প্রায় পাঁচ দশকের সৃষ্টিশীল জীবনে তিনি রচনা করেছেন প্রায় ২০ হাজার গান। তাঁর লেখা ‘একতারা তুই দেশের কথা বল রে এবার বল’, ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’, ‘আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল’, ‘গানেরই খাতায় স্বরলিপি লিখে’, ‘আমার মন বলে তুমি আসবে’, ‘সাগরের তীর থেকে’ কিংবা ‘আমি রজনীগন্ধা ফুলের মতো’—এমন অসংখ্য গান আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
দেশাত্মবোধক গানে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, মাটি ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাঁর গানের কথায় পেয়েছে গভীর আবেগ ও অনন্য প্রকাশভঙ্গি। তাঁর লেখা গান গেয়ে দেশের বহু শীর্ষস্থানীয় শিল্পী পেয়েছেন জনপ্রিয়তা ও সাফল্য। ফলে তাঁর সৃষ্টিকর্ম কেবল একটি সময়ের সংগীত নয়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।
শিল্প-সংস্কৃতির পাশাপাশি রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংগঠনের সভাপতি এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০২ সালে একুশে পদক এবং ২০২১ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। এ ছাড়া একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন তিনি।
মানুষ চলে যায়, থেকে যায় তাঁর সৃষ্টি। গাজী মাজহারুল আনোয়ারও চলে গেছেন চার বছর আগে। কিন্তু তাঁর লেখা গান, তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র আর তাঁর সৃষ্টির অনুরণন এখনো বাঙালির হৃদয়ে বাজে। সময়ের স্রোত তাঁকে আমাদের কাছ থেকে দূরে নিয়ে গেলেও তাঁর গান তাঁকে করে রেখেছে চির অমলিন।
সানা/আপ্র/৪/৯/২০২৬