১৯৭১ সালে শান্তি কমিটির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে বাবা অ্যাডভোকেট আলী আকবরকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। এবার বাবার সেই সময়ের ভূমিকা এবং স্বাধীনতার পর তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন আসিফ।
আসিফ জানান, তাঁর বাবা ছিলেন কুমিল্লা জেলা মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি মুসলিম লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এমনকি ১৯৮০ সালেও দলটির হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন।
মুসলিম লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণেই ১৯৭১ সালে তাঁর বাবা শান্তি কমিটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানান আসিফ। তবে তাঁর দাবি, শান্তি কমিটিতে থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাঁর বাবা সে সময় অনেক মানুষের জীবন, সম্পদ, বাড়িঘর ও এলাকা রক্ষা করেছিলেন।
আসিফ বলেন, ‘আমার বাবা মুসলিম লীগের কুমিল্লা জেলার প্রভাবশালী সেক্রেটারি ছিলেন। তিনি শেষ পর্যন্ত মুসলিম লীগের আদর্শেই বিশ্বাসী ছিলেন। মুসলিম লীগার হওয়ার কারণে শান্তি কমিটির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। তবে শান্তি কমিটিতে থাকার উসিলায় তিনি অনেকের জানমাল, বাড়িঘর ও এলাকা রক্ষা করেছেন।’
মুক্তিযোদ্ধাকে ফাঁসির হাত থেকে বাঁচানোর দাবি
বাবার ভূমিকার উদাহরণ দিতে গিয়ে একটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন আসিফ। তাঁর দাবি, তাঁর বাবা ফাঁসির হাত থেকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচিয়েছিলেন। এসব ঘটনা তাঁর লেখা ‘আকবর ফিফটি নট আউট’ বইয়ে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাঁর বাবার সম্পর্ক কেমন ছিল—এমন প্রশ্নের জবাবে আসিফ বলেন, বিষয়টি সরাসরি এভাবে বলা ঠিক হবে না। তাঁর দাবি, মুসলিম লীগের একজন নেতা হিসেবে তাঁর বাবার ওপর যে দায়িত্ব ছিল, তিনি মূলত সেটিই পালন করেছেন।
আসিফের ভাষায়, ‘যেহেতু তিনি অনেকের জীবন ও জানমাল রক্ষা করেছেন, তাই তাঁকে সরাসরি স্বাধীনতার বিপক্ষ বলা যায় না। মুসলিম লীগের একজন সদস্য হিসেবে তাঁর ওপর যে দায়িত্ব ছিল, তিনি মূলত সেটিই পালন করেছেন।’
ছয় দফার পক্ষে চিঠি দেওয়ার দাবি
বাবার রাজনৈতিক অবস্থান প্রসঙ্গে ছয় দফার কথাও উল্লেখ করেন আসিফ। তাঁর দাবি, ১৯৬৬ সালে ছয় দফা ঘোষণার পর তাঁর বাবা মুসলিম লীগের একজন প্রতিনিধি হিসেবে চিঠি লিখে ছয় দফা মেনে নেওয়া এবং পূর্ব পাকিস্তানকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
তবে সেই চিঠি বর্তমানে পরিবারের কাছে নেই বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, ১৯৭১ সালের সময়কার অনেক কাগজপত্র তখন সংরক্ষণ করা হয়নি। তবে তাঁর বড় ভাইয়েরা বিষয়টি জানেন বলে দাবি করেন আসিফ।
স্বাধীনতার পর কাস্টডিতে যাওয়ার ঘটনা
স্বাধীনতার পর তাঁর বাবার কাস্টডিতে যাওয়ার ঘটনাটিও তুলে ধরেন আসিফ। তিনি জানান, ৮ ডিসেম্বর কুমিল্লা স্বাধীন হওয়ার পর আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট আহমদ আলী তাঁর বাবাকে ফোন করে নিরাপত্তার কারণে কাস্টডিতে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
আসিফের দাবি, নতুন অনেক যুবক মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেওয়ায় তাঁর বাবার নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সেই পরামর্শ অনুযায়ী ১৭ ডিসেম্বর তাঁর বাবা নিজেই কাস্টডিতে চলে যান।
এরপর তাঁর বাবার বিরুদ্ধে কয়েকটি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হয় বলে জানান আসিফ। এর মধ্যে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে হত্যার অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
আসিফ আরো জানান, ১৯৭৪ সালে তাঁর বাবা আইনি লড়াই করে এসব অভিযোগ থেকে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করেন এবং কারাগার থেকে মুক্তি পান।
তিনি বলেন, তাঁর বাবা সাধারণ ক্ষমার মাধ্যমে মুক্তি পাননি; বরং আদালতে আইনি লড়াই করে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েই মুক্তি পেয়েছিলেন। দালাল আইনের অধীনেও তাঁর বাবাকে গ্রেফতার করা হয়নি এবং কোনো সাজাও হয়নি বলে দাবি করেন আসিফ।
১৯৭১ সালে বাবার ভূমিকা নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেই নিজের বক্তব্যে আসিফ একদিকে তাঁর বাবার মুসলিম লীগ ও শান্তি কমিটির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন, অন্যদিকে তাঁর দাবি অনুযায়ী, ওই সময় মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় বাবার ভূমিকার বিষয়টিও তুলে ধরেছেন।
সানা/আপ্র/৪/৯/২০২৬