সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও স্থায়ী বন্যার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার নিচু বদ্বীপ অঞ্চলের বড় শহরগুলোতে বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশের ঢাকা এবং ভারতের কলকাতা ও মুম্বাইসহ এসব এলাকার ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ স্থায়ীভাবে বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়ে ঘরবাড়ি হারানোর তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘ মহাসচিবের ‘সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ এবং তা মোকাবিলার উপায়’ শীর্ষক বিশেষ প্রতিবেদনে এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। গত ৩১ আগস্ট প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ ফোরামের নেতাদের বৈঠকে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; এর প্রভাব ইতিমধ্যে মানুষের জীবন, অবকাঠামো, অর্থনীতি ও উন্নয়নে পড়ছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার কারণে নগর অবকাঠামো, পানি সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা, পরিবহনব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা, ভবন এবং ভূগর্ভস্থ পানির মজুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব মানবাধিকার, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপরও পড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় বড় উদ্বেগ বাস্তুচ্যুতি
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব অঞ্চলভেদে ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি ও নিউইয়র্ক এবং চীনের গুয়াংঝুর মতো উচ্চ আয়ের উপকূলীয় শহরগুলোতে ঝুঁকিতে থাকা সম্পদের আর্থিক মূল্য আনুমানিক ২ লাখ কোটি থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার নিচু বদ্বীপ অঞ্চলে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ মানুষের বাস্তুচ্যুতি।
বিশেষ করে ঢাকা, কলকাতা ও মুম্বাইয়ের মতো শহর ও আশপাশের নিচু উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে স্থায়ী জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। এসব অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ ভবিষ্যতে বসতভিটা ও জীবিকা হারানোর মুখে পড়তে পারেন।
জাতিসংঘের হিসাবে, বিশ্বের প্রায় ৭৭ কোটি মানুষ এমন উপকূলীয় এলাকায় বসবাস করেন, যেগুলো জোয়ারের সর্বোচ্চ সীমার চেয়ে পাঁচ মিটারেরও কম উঁচু। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ এ ধরনের এলাকায় বসবাস করায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি তাদের জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করছে।
২০২৪ সালে সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধিতে নতুন রেকর্ড
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বছরে গড়ে ৪.৭ মিলিমিটার করে বেড়েছে। ২০২৪ সালে এই হার বেড়ে রেকর্ড ৫.৯ মিলিমিটারে পৌঁছায়। অস্বাভাবিক সমুদ্র উষ্ণায়নের কারণে ওই বছর এই নতুন রেকর্ড তৈরি হয়। ২০১২ থেকে ২০২৫ সালের হিসাবেও বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৪.৭৫ মিলিমিটার। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক গড় সমুদ্রপৃষ্ঠ ২০২৪ সালের রেকর্ড উচ্চতার কাছাকাছি ছিল।
জাতিসংঘ বলছে, মানুষের কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং হিমবাহ ও বরফস্তর গলে যাওয়ার ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। সমুদ্র যে বিপুল পরিমাণ তাপ শোষণ করছে, তারও বড় ভূমিকা রয়েছে এই পরিবর্তনে।
বাড়ছে বন্যা, লবণাক্ততা ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় বন্যা, মিষ্টি পানিতে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ, নদীভাঙন এবং বাস্তুতন্ত্রের অবক্ষয় আরও তীব্র হচ্ছে। এর সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পয়োনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্য অবকাঠামো। বাড়ছে পানিবাহিত রোগ, আঘাত ও মৃত্যুর ঝুঁকি এবং মানুষের মানসিক চাপ।
সমুদ্রের লোনা পানি ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠের মিষ্টি পানির উৎসে ঢুকে পড়লে সুপেয় পানির নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে কৃষিজমি ও সেচব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।
ভূমি দেবে যাওয়ার প্রবণতা যেখানে রয়েছে, সেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে মিলিত হয়ে বন্যার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। ফলে উপকূলীয় ও বদ্বীপ অঞ্চলের নগর পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন, কার্যকর পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণব্যবস্থা, বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নের ওপর জোর দিয়েছে জাতিসংঘ। প্রতিবেদনে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও জলবায়ু অভিযোজনের অর্থায়ন বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
সানা/আপ্র/৪/৯/২০২৬