দরিদ্র, অতি দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে সমন্বিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনতে ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে সরকার। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এ নীতিমালায় ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা থেকে আট ধরনের ব্যক্তি বা পরিবারকে বাদ দেওয়ার শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। নীতিমালাটি ২০ আগস্ট সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়।
‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’-এই দর্শনের ভিত্তিতে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে প্রায় দুই কোটি নারী পরিবারপ্রধানকে সরাসরি সরকারি থেকে ব্যক্তি পদ্ধতিতে মাসিক নগদ সহায়তার আওতায় আনা হবে।
যে আট শ্রেণি সুবিধা পাবে না: নীতিমালায় ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বহির্ভূত তালিকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে যে কোনো একটি শর্ত পূরণ হলে সংশ্লিষ্ট পরিবার সুবিধার জন্য অযোগ্য হবে।
১. সরকার নির্ধারিত পিএমটি স্কোরের ঊর্ধ্বসীমার চেয়ে বেশি স্কোর পাওয়া পরিবার ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা পাবে না।
২. পরিবারের মনোনীত নারীপ্রধান সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বেতন-ভাতায় কর্মরত হলে তিনি সুবিধার বাইরে থাকবেন। এমপিওভুক্ত শিক্ষক বা কর্মচারীরাও এ সুবিধা পাবেন না।
৩. পরিবারের মনোনীত নারীপ্রধান নিয়মিত সরকারি পেনশন বা অনুরূপ অবসর সুবিধা গ্রহণ করলে ফ্যামিলি কার্ড পাবেন না। তবে প্রতিবন্ধী সন্তান হিসেবে বিশেষ পেনশন সুবিধা গ্রহণকারী এ শর্তের বাইরে থাকবেন।
৪. পরিবারের কোনো সদস্যের নামে জাতীয় সঞ্চয়পত্রে পাঁচ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ থাকলে পরিবারটি সুবিধার জন্য বিবেচিত হবে না। কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পাঁচ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়, স্থায়ী আমানত বা অন্য কোনো বিনিয়োগ থাকলেও একই বিধান প্রযোজ্য হবে।
৫. পরিবারের কোনো সদস্যের নামে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের নিবন্ধিত তিন বা চার চাকার মোটরযান থাকলে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে না। এর মধ্যে সিএনজি বা পেট্রোলচালিত চার-স্ট্রোক তিন চাকার যান, কার, জিপ, পিকআপ, বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, লরি ও মাইক্রোবাস রয়েছে।
৬. পরিবারের কোনো সদস্যের নামে বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে হালনাগাদ লাইসেন্স বা ব্যবসা থাকলে পরিবারটি সুবিধার বাইরে থাকবে।
৭. পরিবারের কোনো সদস্য নিয়মিত করদাতা হলে এবং তার করযোগ্য আয় থাকলে ওই পরিবার ফ্যামিলি কার্ডের জন্য যোগ্য হবে না।
৮. বসতভিটাসহ পরিবারের মোট আবাদি জমির পরিমাণ শূন্য দশমিক ৫০ একর বা তার বেশি হলে ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া যাবে না। একইভাবে কোনো অকৃষি বা বাণিজ্যিক জমি কিংবা জায়গার বাজারমূল্য পাঁচ লাখ টাকার বেশি হলেও পরিবারটি সুবিধার বাইরে থাকবে।
এক পরিবারে একটিই পরিচিতি: ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে তালিকাভুক্ত প্রতিটি যোগ্য পরিবারের জন্য একটি স্থায়ী ও অনন্য পরিচিতি নম্বর দেওয়া হবে। ‘ওয়ান-আইডি’ নামে এ পরিচিতি ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট পরিবারের কেন্দ্রীয় পরিচিতি হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
নীতিমালা অনুযায়ী এই পরিচিতি নম্বর শুধু কার্ডের পরিচয় হিসেবে নয়, রাষ্ট্রীয় তথ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত তথ্যভান্ডারের অংশ হিসেবেও ব্যবহৃত হবে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে জাতীয় স্বার্থে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এ তথ্য ব্যবহারের সুযোগ পাবে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মূল লক্ষ্যও শুধু নগদ সহায়তা দেওয়া নয়; একটি সমন্বিত সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি সুবিধা একই পরিচিতির আওতায় নিয়ে আসা।
একসঙ্গে একাধিক সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা নয়: ফ্যামিলি কার্ডের মনোনীত নারী পরিবারপ্রধান একই সময়ে অন্য কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সমজাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে আর্থিক, খাদ্য বা অন্য কোনো সুবিধা নিতে পারবেন না।
কোনো নারী পরিবারপ্রধান আগে থেকেই টিসিবির স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট বা ভিডব্লিউবি কর্মসূচির সুবিধা পেয়ে থাকলে কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার যাচাইয়ের মাধ্যমে আগের সুবিধা বাতিল বা স্থগিত করা হবে।
একইভাবে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা বা সমজাতীয় সরকারি নগদ সহায়তা গ্রহণকারী নারী পরিবারপ্রধান ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা নেওয়ার সময় আগের সুবিধা রাখতে পারবেন না। তবে মনোনীত নারী প্রধান ছাড়া পরিবারের অন্য সদস্যরা প্রচলিত নিয়মে অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন।
এনআইডি থেকে ভূমি ও ব্যাংকের তথ্য যাচাই: আবেদনকারীর তথ্যের সত্যতা ও যোগ্যতা যাচাইয়ে বিভিন্ন সরকারি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তিগত সংযোগ স্থাপনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, ভূমি মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগের আওতাধীন তথ্যব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় তথ্য সংযোগ করা হবে। কারিগরি প্রয়োজনে সরকার পরবর্তী সময়ে এসব তথ্যের পরিধি বা সংযোগব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস করতে পারবে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে দরিদ্র পরিবার শনাক্ত করতে পিএমটি স্কোরিং ব্যবস্থার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে।
তথ্য যাচাইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার: ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও যন্ত্রশিক্ষাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, গতিশীল সামাজিক নিবন্ধনে সংরক্ষিত তথ্যে অসঙ্গতি বা জালিয়াতি শনাক্ত ও প্রতিরোধে প্রয়োজনে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে।
এর ফলে একজন আবেদনকারীর আয়, সঞ্চয়, জমি, যানবাহন, কর প্রদান কিংবা অন্য কোনো সরকারি সুবিধা গ্রহণের তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি থাকলে তা শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে। এতে একই পরিবারের একাধিক সুবিধা গ্রহণ, তথ্য গোপন বা ভুল তথ্য দিয়ে সুবিধা নেওয়ার ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।
সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ফ্যামিলি কার্ডকে শুধু নগদ সহায়তার মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে একটি সমন্বিত পরিচিতির আওতায় আনার ডিজিটাল অবকাঠামো হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/৩১/৮/২০২৬