গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

প্রকল্পসহ দ্বিপক্ষীয় সহায়তাও বড় ধরনের কাটছাঁট

কমছে যুক্তরাজ্যের সহায়তা, ঝুঁকিতে সুন্দরবনের হাজারো মানুষ

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২:১৩ পিএম, ২৩ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১৫:১৭ এএম ২০২৬
কমছে যুক্তরাজ্যের সহায়তা, ঝুঁকিতে সুন্দরবনের হাজারো মানুষ
ছবি

সুন্দরবন এলাকার হাজারো ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে -ছবি রয়টার্স

যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক সহায়তা কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় পরিচালিত একটি বড় প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই বন্ধ করতে হচ্ছে। এতে সুন্দরবন এলাকার হাজারো ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে গত আড়াই বছরে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের স্থায়িত্ব নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।


ব্রিটিশ উন্নয়ন সংস্থা প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন ২০২৩ সাল থেকে সুন্দরবন এলাকায় প্রকল্পটির একটি অংশ পরিচালনা করে আসছে। প্রকল্পটি ২০২৮ সাল পর্যন্ত চলার কথা ছিল। কয়েক হাজার পরিবারের জীবনযাত্রার উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় তাদের সক্ষমতা বাড়ানোই ছিল এর মূল লক্ষ্য।
প্রকল্পের আওতায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, মাছ চাষের প্রযুক্তি ও উপকরণ এবং অতিবৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।


কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিলে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনকে জুনের মধ্যেই প্রকল্পটি শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। সংস্থাটির প্রচেষ্টার পর সময়সীমা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হলেও নির্ধারিত মেয়াদের অনেক আগেই প্রকল্পটি গুটিয়ে নিতে হচ্ছে। প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের প্রধান তামান্না রহমান জানান, ২০২৬ সালের মধ্যে প্রকল্পটির জন্য ২২ লাখ পাউন্ড পাওয়ার কথা থাকলেও তারা এর তুলনায় অনেক কম অর্থ পেয়েছেন। ফলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ ৫৭ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্য থাকলেও প্রায় ৩৭ হাজার মানুষকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে।


তার মতে, হঠাৎ প্রকল্প বন্ধের সিদ্ধান্ত স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সংস্থাটির দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে ইতিমধ্যে নেওয়া উদ্যোগগুলোর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশকে দেওয়া যুক্তরাজ্যের দ্বিপক্ষীয় সহায়তাও বড় ধরনের কাটছাঁটের মুখে পড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ সহায়তার পরিমাণ ৬ কোটি ৬৭ লাখ পাউন্ড থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৩ কোটি ১০ লাখ পাউন্ডে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
জলবায়ু ঝুঁকিতে সুন্দরবন: গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর মিলনস্থলের বিশাল বদ্বীপ এলাকায় অবস্থিত সুন্দরবন বিশ্বের সবচেয়ে বড় জোয়ার-ভাটানির্ভর ম্যানগ্রোভ বন। প্রায় ১০ হাজার ২৭৭ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই বনাঞ্চলে বাঘ, নদীর ডলফিনসহ বিভিন্ন প্রাণী ও প্রায় ৩০০ প্রজাতির পাখি রয়েছে। সুন্দরবনের আশপাশের অনেক মানুষ দীর্ঘদিন ধরে মাছ, জ্বালানি কাঠ ও মধু সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। অনেকে কৃষিকাজে যুক্ত হলেও দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে তারা দেশের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছেন।


২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার ক্ষতও অনেক পরিবার এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ওই ঘূর্ণিঝড়ে সুন্দরবন এলাকায় ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষতি হয় এবং অনেক এলাকার ভূপ্রকৃতিও বদলে যায়। এর পাশাপাশি সুন্দরবন এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বছরে প্রায় ৩ সেন্টিমিটার করে বাড়ছে, যা বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। এতে অনেক বসতি হুমকির মুখে পড়ছে এবং লবণাক্ততার কারণে কৃষিজমির উর্বরতা কমছে।


কালাবগী গ্রামের বাসিন্দা বিনা মণ্ডল জানান, আইলার আগে তাদের গ্রামে প্রশস্ত রাস্তা, ভালো কৃষিজমি ও ফলের গাছ ছিল। ঘূর্ণিঝড়ে রাস্তা ও বাঁধ ধ্বংস হওয়ার পর মাছ ধরা তাদের পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস হয়ে ওঠে। বিশুদ্ধ পানির সংকটও রয়েছে। অনেক সময় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করেই পানির চাহিদা মেটাতে হয়। মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ায় আয়ও কমেছে। বিনা মণ্ডলের পরিবারকে অনেক সময় দিনে মাত্র একবেলা খাবার রান্না করতে হয়। প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের দেওয়া ছোট একটি সৌরপ্যানেল তার পরিবারের জন্য বড় সহায়তা হয়েছে। সৌরবিদ্যুতের কারণে সন্ধ্যার পরও কাজ করতে পারছেন এবং আয় বাড়ছে বলে জানান তিনি। আগে মাছ ধরে মাসে প্রায় ২ থেকে ৩ হাজার টাকা আয় হলেও এখন তা বেড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। আরেক বাসিন্দা বসন্তী মণ্ডল পেয়েছেন সৌরবিদ্যুৎচালিত ধান ভাঙানোর মেশিন। আগে তাকে বিভিন্ন কৃষকের বাড়িতে কাজের সন্ধানে যেতে হতো। এখন বাড়িতে থেকেই আয় করতে পারছেন এবং সন্তানদের সময় দিতে পারছেন।
মাঝপথে থামবে অনেক উদ্যোগ: প্রকল্পটি দ্রুত বন্ধের সিদ্ধান্তে স্থানীয় অনেক মানুষ হতাশ হয়েছেন। প্রকল্পের কর্মীদের ভাষ্য, কেউ কেউ এ সিদ্ধান্তের কথা শুনে কেঁদেছেন। বিভিন্ন উদ্যোগের সুফল পাওয়া শুরু হওয়ার সময়েই কেন সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, তা বুঝতে পারছেন না তারা। এমনকি ১৪০ জন উদ্যোক্তাকে নিয়ে নেওয়া একটি উদ্যোগও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। এসব উদ্যোক্তাকে প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রাথমিক প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেলে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রশিক্ষণের অভাবে তারা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা করছে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন।


তামান্না রহমান বলেন, প্রকল্পটি ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চলার কথা থাকলেও মাত্র দুই থেকে তিন মাসের নোটিশে তা গুটিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। সাধারণত প্রকল্প শেষ করার আগে স্থানীয় জনগণকে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং স্থানীয় সরকারের কাছে কার্যক্রম হস্তান্তরের পরিকল্পনা থাকে। এবার সে কাজ পুরোপুরি করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রকল্পটি চালিয়ে নিতে বিভিন্ন ফাউন্ডেশনের কাছ থেকে নতুন অনুদান পাওয়ার চেষ্টা করছে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন। তবে হঠাৎ প্রকল্প বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় নতুন অর্থের ব্যবস্থা করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যাচ্ছে না। তামান্না রহমান বলেন, বাংলাদেশের মতো ১৭ কোটি মানুষের দেশে বিদেশি সরকারের অনুদান দিয়ে সবাইকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব নয়। তবে সবচেয়ে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করাও কঠিন। তার মতে, সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের উল্লেখযোগ্য নগদ আয় নেই। ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে যোগাযোগ ও অবকাঠামো ব্যবস্থাও দুর্বল। ফলে এসব এলাকায় বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন। উন্নয়ন সংস্থা মার্সি কর্পসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জলবায়ু অভিযোজনের অর্থায়নের প্রয়োজনের মাত্র ৩ শতাংশ এখন পর্যন্ত বেসরকারি খাত থেকে এসেছে। যুক্তরাজ্যের উন্নয়ন সংস্থাগুলোর নেটওয়ার্ক বন্ডের প্রধান রোমিলি গ্রিনহিল বলেন, যুক্তরাজ্যের অর্থায়নে পরিচালিত মানবিক ও জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য বড় ধাক্কা। তিনি যুক্তরাজ্য সরকারকে বৈদেশিক সহায়তা আরো কমানো বন্ধ করা এবং দেশটির মোট জাতীয় আয়ের শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সহায়তা ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়ার আহ্বান জানান।


এদিকে যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক উন্নয়ন দপ্তর জানিয়েছে, তারা অনুদানভিত্তিক বৈদেশিক সহায়তা কমিয়ে সরকারগুলোর সঙ্গে সরাসরি অংশীদারত্ব বাড়াতে চায়। এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সরকারি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বেসরকারি অর্থায়ন কাজে লাগানোর লক্ষ্য রয়েছে। তবে তামান্না রহমানের আশঙ্কা, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম সুন্দরবন এলাকায় সরাসরি সরকারের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। এসব এলাকায় কাজ করার মতো প্রয়োজনীয় জনবল, দক্ষতা ও সক্ষমতা সরকারের সবসময় থাকে না বলেও তিনি মনে করেন। সূত্র: দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট
সানা/আপ্র/২৩/৮/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

পীরগঞ্জে পৌর ভবনের ছাদ ধসে দুই শ্রমিকের মৃত্যু, দায় কার?
১৪ অক্টোবর ২০২৬

পীরগঞ্জে পৌর ভবনের ছাদ ধসে দুই শ্রমিকের মৃত্যু, দায় কার?

তদন্ত কমিটি গঠন; মামলায় আসামি ৯

পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সরছে সচিবালয়, হবে নতুন সড়ক
১১ অক্টোবর ২০২৬

পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সরছে সচিবালয়, হবে নতুন সড়ক

প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা

স্ত্রী হত্যার অভিযোগে শুরু, ১২ বছরে ধর্ষণ-খুনের একাধিক অভিযোগ
০৭ অক্টোবর ২০২৬

স্ত্রী হত্যার অভিযোগে শুরু, ১২ বছরে ধর্ষণ-খুনের একাধিক অভিযোগ

মনিরুজ্জামান মাতুব্বরের বিরুদ্ধে অভিযোগ

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পরিচয় যা-ই হোক, চাঁদাবাজ-দখলদারদের ছাড় নয়: ডিএমপি কমিশনার

চাঁদাবাজ, ভূমি দখলবাজ ও মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় বা অবস্থান বিবেচনা না করে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ। এসব অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানো যাবে না বলেও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে ডিএমপি সদর দপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সেপ্টেম্বর মাসের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় উপস্থিত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এসব নির্দেশনা দেন কমিশনার। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন- কমিশনার যে নির্দেশনা দিয়েছেন, পুলিশ সদস্যরা তা বাস্তবে তা করতে পারবেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে