প্রশান্ত মহাসাগরে দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে সমুদ্রের পানি। এর মধ্যেই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এল নিনিও। আগামী কয়েক মাসে এই প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রবাহ আরও তীব্র হয়ে অত্যন্ত শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এল নিনিও স্থায়ী থাকার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ শতাংশ। চলতি বছরের শেষ দিকে এটি সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছাতে পারে। সংস্থাটি জানিয়েছে, এবারের এল নিনিও এতটাই শক্তিশালী হতে পারে যে তাদের পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার পরের কয়েক দশকের ব্যবহৃত মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, এল নিনিও এখন অত্যন্ত শক্তিশালী রূপ নিচ্ছে। তার ভাষায়, পৃথিবী এমন এক পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে, যেখানে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে এবং মহাসাগরগুলো ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে।
এল নিনিও কেন এত ভয়ংকর
এল নিনিও হলো প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের নিরক্ষীয় সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণ হয়ে ওঠার সঙ্গে যুক্ত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রবাহ। এর প্রভাবে বায়ুমণ্ডলীয় চলাচল, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার স্বাভাবিক ধরন বদলে যেতে পারে।
বিশ্বের সব অঞ্চলে এর প্রভাব এক রকম হয় না। কোথাও অতিরিক্ত বৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে, আবার অন্য কোথাও দেখা দিতে পারে তীব্র খরা, দাবদাহ ও দাবানল। এল নিনিওর তীব্রতা বেশি হলেই কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা একই অনুপাতে বাড়বে—এমন সরাসরি সম্পর্কও নেই। স্থানীয় ও আঞ্চলিক অন্যান্য জলবায়ুগত কারণও পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে।
অস্বাভাবিক উষ্ণ প্রশান্ত মহাসাগর
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য বলছে, এল নিনিওর মূল অঞ্চল মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। মে থেকে জুলাইয়ে নিনিও ৩.৪ অঞ্চলে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে গড়ে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
জুলাইয়ের শেষ থেকে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে সাপ্তাহিক হিসাবে এই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ২ দশমিক ২ থেকে ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। সমুদ্রের তলদেশেও অস্বাভাবিক উষ্ণতা দেখা গেছে। কিছু এলাকায় জুলাই ও আগস্টের শুরুতে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি ছিল।
এই বিপুল উষ্ণ সমুদ্রের পানি এল নিনিওকে আরও শক্তিশালী করার জন্য জ্বালানি হিসেবে কাজ করতে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা।
বাড়ছে তাপ, বদলাবে বৃষ্টির ধরন
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের পূর্বাভাসে বিশ্বের প্রায় সব স্থলভাগেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। একই সময়ে এল নিনিওর কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরনেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
তীব্র এল নিনিওর প্রভাবে কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়তে পারে। আবার অন্য অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও শক্তিশালী ঝড়ের মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ভারত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের উষ্ণতাসহ অন্যান্য জলবায়ুগত কারণও এল নিনিওর আঞ্চলিক প্রভাবকে বাড়াতে, কমাতে বা পরিবর্তন করতে পারে।
প্রস্তুতি জোরদারের আহ্বান
এল নিনিওর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের আবহাওয়া ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলোকে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা। কৃষি, স্বাস্থ্য, পানি ও জ্বালানির মতো জলবায়ু-সংবেদনশীল খাতেও আগাম সতর্কতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেছেন, এই ব্যতিক্রমী এল নিনিওর জন্য ব্যতিক্রমী প্রস্তুতি প্রয়োজন। তার মতে, খরা ও বন্যার কারণে ইতোমধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে যে ধরনের দেখা যাচ্ছে, এল নিনিও আরও শক্তিশালী হলে তা বাড়তে পারে।
২০২৭ সাল পর্যন্ত প্রভাব
পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনিও চলতি বছরের শেষ দিকে সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছাতে পারে। তবে এর প্রভাব সেখানেই শেষ হবে না। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার হিসাবে, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এল নিনিও স্থায়ী থাকার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ শতাংশ। ফলে আগামী কয়েক মাসে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের অস্বাভাবিকতার পাশাপাশি খরা, বন্যা ও চরম তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে বিজ্ঞানীদের মতে, এল নিনিও নিজে কোনো অস্বাভাবিক বা কৃত্রিম ঘটনা নয়; এটি পৃথিবীর প্রাকৃতিক জলবায়ু ব্যবস্থার একটি অংশ। উদ্বেগের জায়গা হলো—বর্তমান উষ্ণায়ন পরিস্থিতির মধ্যে শক্তিশালী এল নিনিও যুক্ত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ডিসি/আপ্র/০৩/০৯/২০২৬