প্রোগ্রামিং সম্পর্কে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা নেই। তবু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় একটি অ্যাপ তৈরি করে মাত্র তিন দিনে প্রায় ৩ লাখ ২৮ হাজার টাকার বিক্রি করেছেন চীনের ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী। শুধু তাই নয়, ওই অ্যাপের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ের একটি প্রতিযোগিতায় তৃতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি।
কিশোরীর নাম ঝু শুহান। চীনের সাংহাইয়ের একটি জুনিয়র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সে। গত বছর থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার শুরু করে শুহান। সম্প্রতি হাংঝৌতে অনুষ্ঠিত জাতীয় এআই পণ্য বিপণন প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় সে।
২১ থেকে ২৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত ওই প্রতিযোগিতায় ৫০ জনের বেশি প্রতিযোগী অংশ নেন। প্রতিযোগিতায় তৃতীয় পুরস্কার জিতে শুহান পুরস্কার হিসেবে পায় ৫ হাজার ইউয়ান, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৯১ হাজার টাকা।
তবে পুরস্কারের চেয়েও বেশি আলোচনায় এসেছে তার তৈরি অ্যাপ থেকে পাওয়া আয়।
তিন দিনে ৯০টি অর্ডার
প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতার পরিবর্তে তাদের তৈরি এআই অ্যাপ তিন দিনে কত আয় করেছে, তার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়।
শুহানের তৈরি অ্যাপটির নাম ‘জাই চাং’, যার ইংরেজি অর্থ ‘অন সাইট’। প্রতিযোগিতার তিন দিনে অ্যাপটি ৯০টি অর্ডার পায়। এতে মোট ১৮ হাজার ইউয়ান বিক্রি হয়, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা।
এই বিক্রির পরিমাণই তাকে প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান এনে দেয়।
শিশুদের পড়াশোনায় নজরদারির অ্যাপ
শুহানের তৈরি অ্যাপটি মূলত শিশুদের পড়াশোনার সময় নজরদারিতে অভিভাবকদের সহায়তা করে।
কোনো অভিভাবক অ্যাপটিতে নিজের একটি ছবি আপলোড করলে সেটি ভার্চুয়াল অভিভাবকের রূপ নেয়। শিশু পড়তে বসার পর অ্যাপটি ক্যামেরার মাধ্যমে তার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে।
শিশু মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে বা পড়ার জায়গা ছেড়ে উঠে গেলে ভার্চুয়াল অভিভাবক কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে তাকে সতর্ক করে। পড়াশোনা শেষে অ্যাপটি শিশুর মনোযোগের ওপর একটি প্রতিবেদনও তৈরি করে।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই ধারণা
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই অ্যাপটি তৈরির ধারণা পেয়েছে শুহান। তার বাবা-মা ব্যস্ত থাকায় পড়ার সময় নিয়মিত তার পাশে থাকতে পারতেন না। ফলে পড়তে বসে অনেক সময় সে নিজেই মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ত।
শুহানের ভাষ্য, তার অনেক সহপাঠীরও একই সমস্যা রয়েছে। তাই পড়ার সময় শিশুদের পাশে থাকার জন্য সে একটি ‘ডিজিটাল অভিভাবক’ তৈরির চিন্তা করে।
এআইয়ের সহায়তায় তৈরি হয়েছে কোড
অ্যাপটি তৈরির জন্য শুহানের কোনো প্রোগ্রামিং প্রশিক্ষণ ছিল না। নিজের ভাষায় সে বৃহৎ ভাষা মডেলকে অ্যাপটির ধারণা বুঝিয়ে দেয়। এরপর এআইয়ের সহায়তায় কোড তৈরি করে অ্যাপটি দাঁড় করায় সে।
অ্যাপটির নকশা থেকে শুরু করে মূল কার্যক্রম চালু করা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় তার সময় লাগে মাত্র তিন থেকে চার দিন। কোনো নির্দিষ্ট কারিগরি সমস্যায় পড়লে এআইভিত্তিক প্রোগ্রামিং সরঞ্জামের সাহায্য নিয়েছে সে।
‘রাগী মা’ বাদ দিয়েছে শুহান
অ্যাপটির প্রাথমিক সংস্করণে ‘মা রেগে যাচ্ছে’ নামে একটি ফিচার ছিল। শিশু বারবার পড়াশোনায় মনোযোগ হারালে এই ফিচারের মাধ্যমে তাকে সতর্ক করার পরিকল্পনা ছিল।
তবে পরে শুহান সেটি বাদ দেয়। তার যুক্তি, শিশুদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে চায় না সে। তার মতে, ভুল ধরিয়ে দেওয়ার চেয়ে শিশুদের ভুল থেকে শেখা এবং নিজেদের উন্নত করার সুযোগ দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম ব্যবহারকারী নিজের ছোট ভাই
শুহানের প্রথম দিকের ব্যবহারকারীদের একজন তার ছোট ভাই। সে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। শুহানের দাবি, অ্যাপটি ব্যবহারের পর তার ভাই আগের তুলনায় আরও মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করছে।
এখন আরও মানুষের কাছে অ্যাপটি পৌঁছে দিতে চায় শুহান। কম দামে এটি বাজারজাত করার পরিকল্পনাও রয়েছে তার। ব্যবহারকারীরা আগ্রহ দেখালে অ্যাপটির আরও উন্নয়ন চালিয়ে যেতে চায় এই কিশোরী।
সৃজনশীল একটি ধারণাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় বাস্তবে রূপ দেওয়ার কারণে অনলাইনে শুহানের উদ্যোগের প্রশংসা করছেন অনেকে। কারও মতে, এআই ব্যবহার করে বাস্তব সমস্যার সমাধান তৈরি করার সক্ষমতাই তার সবচেয়ে বড় সাফল্য।
সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
এসি/আপ্র/০৩/০৯/২০২৬