এস এ খান শিল্টু: ‘স্বৈরাচারের দোসর’ হয়ে এখনো কিছু পুলিশ সদস্য পুরোনো আচরণ থেকে বের হতে পারেননি—এমন অভিযোগ তুলে তাঁদের ‘মানুষ হওয়ার’ পরামর্শ দিয়েছেন মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা কলেজ ও মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির নেতারা। একই সঙ্গে মিথ্যা মামলায় শিক্ষকদের চোর-ডাকাতের মতো গ্রেপ্তার করে হাতকড়া পরানোর অভিযোগ তুলে তাঁরা সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের কঠোর সমালোচনা করেন। এমন পুলিশ সদস্যদের নিজেদের সন্তানদের কোনো শিক্ষকের কাছে পড়াশোনা না পাঠানোরও পরামর্শ দেন শিক্ষক নেতারা।
কাজিপুর ডিগ্রি কলেজের দুই শিক্ষক ও কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার এবং ওই ঘটনায় জড়িত পুলিশের এক উপপরিদর্শককে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। একই সঙ্গে পরীক্ষাকেন্দ্রে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ ও ভিডিও ধারণের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান শিক্ষক নেতারা।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার আগে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে শিক্ষক নেতারা এসব কথা বলেন।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, শিক্ষকরা সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার কারিগর। অথচ একজন শিক্ষককে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে টেনে-হিঁচড়ে গ্রেপ্তার করে পরে হাতকড়া পরানোর ঘটনা পুরো শিক্ষক সমাজকে অপমানিত করেছে। কোনো শিক্ষক অপরাধ করলে প্রচলিত আইনে তাঁর বিচার হবে। কিন্তু কাউকে অমানবিক বা অসম্মানজনকভাবে গ্রেপ্তার করার ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ঘটনার সূত্রপাত পরীক্ষাকেন্দ্রে: গত ২৮ আগস্ট গাংনী উপজেলার কাজিপুর ডিগ্রি কলেজে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএ ও বিএসএস প্রথম বর্ষের ইংরেজি প্রথম পত্রের পরীক্ষা চলাকালে ঘটনাটির সূত্রপাত। শিক্ষক সমিতির দেওয়া স্মারকলিপিতে অভিযোগ করা হয়েছে, দুই সাংবাদিক ছাত্র পরিচয়ে মুখে মাস্ক পরে ক্যামেরা ও মুঠোফোন নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশ করেন এবং পরীক্ষার কক্ষে ভিডিও ধারণ করেন।
এ সময় কলেজের সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিজ্ঞান) মো. মনিরুজ্জামান বিপ্লব ও সহকারী অধ্যাপক (অর্থনীতি) মো. রফিকুজ্জামানের সঙ্গে ওই সাংবাদিকদের বাকবিতণ্ডা হয় বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ঘটনাটি নিয়ে ভিন্ন অভিযোগও রয়েছে। প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে দুই সাংবাদিকের দাবি, পরীক্ষাকেন্দ্রে কয়েকজন পরীক্ষার্থীকে বই দেখে উত্তর লিখতে দেখে তাঁরা এর ভিডিও ধারণ করছিলেন। এ সময় তাঁদের ওপর হামলা, মারধর, মুঠোফোন ও সংবাদ সংগ্রহের সরঞ্জাম কেড়ে নেওয়া এবং একটি কক্ষে আটকে রাখার অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক মনিরুজ্জামান বিপ্লব অবশ্য সাংবাদিকদের মারধর ও তাঁদের মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
পরবর্তীতে পরীক্ষায় বই দেখে উত্তর লেখার ঘটনায় চার পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার এবং পরীক্ষা-সংক্রান্ত সব কার্যক্রম থেকে দুই শিক্ষককে অব্যাহতি দেওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
শিক্ষক নেতারা বলেন, তাঁরা কোনোভাবেই পরীক্ষায় নকলের পক্ষে নন। পরীক্ষাকেন্দ্রে অনিয়ম হয়ে থাকলে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে সাংবাদিকদের কাছে অনিয়মের তথ্য থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে বিধি মেনে পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশ করা প্রয়োজন ছিল। তাঁদের অভিযোগ, অনুমতি ছাড়া পরীক্ষাকক্ষে প্রবেশ ও ভিডিও ধারণের মাধ্যমে পরীক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।
মামলা প্রত্যাহারের দাবি
ঘটনার পর গাংনী থানায় একটি মামলা করা হয়। শিক্ষক সমিতির স্মারকলিপিতে মামলাটির নম্বর ৪৬ এবং তারিখ ২৮ আগস্ট ২০২৬ উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় দণ্ডবিধির ৩২৩, ৩৭৯ ও ১১৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে কাজিপুর ডিগ্রি কলেজের ওই দুই শিক্ষকসহ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে আসামি করা হয়েছে বলে শিক্ষক সমিতি জানিয়েছে।
মামলার পর অভিযুক্ত দুই শিক্ষক মেহেরপুর জেলা আদালতে জামিনের জন্য হাজির হলে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করে এবং পরে হাতকড়া পরিয়ে থানায় নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন শিক্ষক নেতারা। এ ঘটনায় শিক্ষক সমাজের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে বলেও তাঁরা দাবি করেন।
শিক্ষক নেতারা বলেন, কোনো শিক্ষক অপরাধ করলে আইনের আওতায় তাঁর বিচার হবে। কিন্তু আদালত প্রাঙ্গণ থেকে একজন শিক্ষককে যেভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তা তাঁর পেশাগত মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁরা ঘটনার তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
স্মারকলিপিতে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—কাজিপুর ডিগ্রি কলেজের দুই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার; পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে পরীক্ষার্থীদের নির্বিঘ্নে অংশগ্রহণের পরিবেশ নিশ্চিত করা; পরীক্ষাকেন্দ্রে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ ও ভিডিও ধারণের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া; সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা—উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ট্যাগ কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানের অনুমতি ছাড়া বহিরাগত সাংবাদিকদের পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশ বন্ধে প্রশাসনিক নির্দেশনা জারি করা এবং শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
শিক্ষক নেতারা বলেন, পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি অনিয়মের তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ও বিধিসম্মতভাবে কাজ করা প্রয়োজন। কোনো পক্ষ যাতে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে, সে পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা দাবি করেন তাঁরা।
সমাবেশ থেকে শিক্ষক নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তাঁদের দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা না হলে বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। বিশেষ করে মামলা প্রত্যাহার ও শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা রক্ষায় প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ না এলে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দেন তাঁরা।
বক্তব্য দেন বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির গাংনী উপজেলা শাখার সভাপতি অধ্যাপক বেদারুল ইসলাম, মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি সৈয়দ জাকির হোসেন, কারিগরি শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও গাংনী টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ স্বপন, গাংনী উপজেলা শাখার সভাপতি জামাল হোসেন, গাংনী পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান বাবলু এবং সিএফএম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আল হেলাল।
করমদী ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক ও শিক্ষক নেতা আবু সাদাদ মো. সায়েম পল্টুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন রাইপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান, জোতি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খুরশিদা খানম, জুগিন্দা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল করিমসহ বিভিন্ন কলেজ ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।
সানা/আপ্র/৩/৯/২০২৬