বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে আগামী নভেম্বরে। তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটকে একটি প্যাকেজের আওতায় এনে নতুন একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। তবে টুর্নামেন্টটির চূড়ান্ত নাম এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
নতুন এই ব্যবস্থায় টি-টোয়েন্টি, ওয়ানডে ও চার দিনের—তিন ফরম্যাটের জন্য একসঙ্গেই অনুষ্ঠিত হবে ক্রিকেটার ড্রাফট। তবে তিন ফরম্যাটের ড্রাফট একসঙ্গে হলেও টুর্নামেন্টগুলো মাঠে গড়াবে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে। ড্রাফট এক বছরের জন্য নাকি দীর্ঘমেয়াদী হবে, সেই বিষয়টিও এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে—২৫ বা ২৬ তারিখের মধ্যে—বড় পরিসরে নতুন টুর্নামেন্টের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হতে পারে। পরিকল্পনার বড় অংশই ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান তিনি।
তামিম বলেন, “আমরা যেভাবে পরিকল্পনা করছি, আশা করি আপনারা খুশি হবেন। নতুন যে টুর্নামেন্ট নিয়ে কথা বলছি, সেটা ক্রিকেটারদের যেমন উপকার করবে, সাংবাদিকদের জন্যও কভার করা আনন্দের হবে। আমার কাজের প্রায় ৮৫ শতাংশ শেষ। এখন নিয়মকানুন ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে কাজ হচ্ছে।”
নতুন টুর্নামেন্টে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদেরও খেলানোর পরিকল্পনা করছে বিসিবি। তবে জাতীয় দলের ব্যস্ত সূচি এবং ক্রিকেটারদের বিশ্রাম ও কাজের চাপ বিবেচনা করেই তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। প্রথম আসরেই জাতীয় দলের সব ক্রিকেটারকে দেখা যাবে বলে আশা করছেন তামিম। তিনি বলেন, “জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা আর্থিকভাবেও এখন ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলে লাভবান হবে। তবে তারা সারা বছরই ব্যস্ত থাকে। তাদের শরীরের বিশ্রামও প্রয়োজন। তাই কাজের চাপ বা ওয়ার্কলোডের কোনো সমস্যা না থাকলে আমি নিশ্চিত, তারা খেলবে।”
ঘরোয়া ক্রিকেটে নতুন করে আকর্ষণ ফিরিয়ে আনাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। তামিম মনে করেন, শুধু টুর্নামেন্টের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না, দেশের ক্রিকেটে প্রতিযোগিতার পরিবেশ এবং দর্শকদের আগ্রহও বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে ফ্লেভার আনা খুব গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের আগ্রহ ফিরিয়ে আনাও জরুরি। কতটা সফল হব, সেটা সময়ই বলবে। তবে আশা করি, এই টুর্নামেন্ট ঘরোয়া ক্রিকেটে সেই আগ্রহ ফিরিয়ে আনবে।”
এই নতুন টুর্নামেন্ট আয়োজনের ক্ষেত্রে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে চায় বিসিবি। বিশেষ করে চার দিনের ক্রিকেটের দেশের একমাত্র ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট বাংলাদেশ ক্রিকেট লীগে দীর্ঘদিন ধরে একটি দল নিজ খরচে পরিচালনা করেছে বোর্ড। কিন্তু নানা কারণে সময়ের সঙ্গে এই টুর্নামেন্ট থেকে আগ্রহ হারাতে শুরু করে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। গত আসরে চারটি দলই নিজেদের খরচে পরিচালনা করতে হয়েছিল বিসিবিকে। একই অভিজ্ঞতা হয়েছে বিপিএলেও—একটি আসর শুরুর আগে চট্টগ্রাম রয়্যালসের মালিকপক্ষ দল পরিচালনায় অপারগতা জানিয়ে সরে গেলে বিসিবিকেই দলটির দায়িত্ব নিতে হয়েছিল।
ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে বারবার দল পরিচালনা করতে গিয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে বিসিবি। তাই এবার নতুন টুর্নামেন্টে নিজেদের কোনো দল পরিচালনা করতে চায় না বোর্ড। সব ছয়টি দলই করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে স্পন্সরশিপ বা মালিকানার ভিত্তিতে দেওয়া হবে।
বিসিবির টুর্নামেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, “টুর্নামেন্টের নাম এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এনসিএল টি-টোয়েন্টি, যেখানে আগে আটটি দল অংশ নিত; বিসিএলের চার দিনের ম্যাচ এবং বিসিএল ওয়ানডে—এই তিনটি টুর্নামেন্টকে একটি প্যাকেজের আওতায় এনে ছয়টি দল গঠন করা হচ্ছে। এরপর দলগুলোর স্পন্সরশিপ বা মালিকানা করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে হস্তান্তর করা হবে। আমরা, বিসিবি, সেখানে কোনো দল পরিচালনা করব না।”
তবে এই নতুন প্রতিযোগিতার নাম নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন তথ্য ছড়িয়ে পড়লেও সেগুলো সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন তামিম। তার মতে, আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগে কোনো নাম বা তথ্য নিশ্চিতভাবে প্রকাশ করা উচিত নয়। তিনি বলেন, “টুর্নামেন্ট নিয়ে ছড়িয়ে পড়া নামগুলো সঠিক নয়। বোর্ডের পক্ষ থেকে অফিশিয়াল ঘোষণার আগে আমাদের সকলেরই তথ্য গোপন রাখা উচিত, যাতে কোনো একজন সাংবাদিক একক সুবিধা না পেয়ে সবাই সমান তথ্য পান।”
বিগত বিপিএলের অব্যবস্থাপনা ও ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক-সংক্রান্ত সমস্যার কথাও মাথায় রেখেছে বিসিবি। তামিম জানিয়েছেন, অতীতের সেই অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়েই নতুন টুর্নামেন্টের আর্থিক ও সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।
নতুন টুর্নামেন্টের পাশাপাশি দ্বিতীয় একাদশের ক্রিকেটও চালু হচ্ছে। এতে জাতীয় লিগ কিংবা অন্য কোনো দলের স্কোয়াড থেকে বাদ পড়া ক্রিকেটারদের জন্য বাড়তি খেলার সুযোগ তৈরি হবে। তামিমের হিসাবে, প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ ক্রিকেটার নতুন করে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলার সুযোগ পাবেন।
নভেম্বরে নতুন টুর্নামেন্ট শুরু করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বিসিবি। তার আগে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে আসতে পারে টুর্নামেন্টের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।
ডিসি/আপ্র/০৩/০৯/২০২৬