পানি জীবনের অপরিহার্য উপাদান। সেই পানির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা মানে জনস্বাস্থ্যের মৌলিক নিরাপত্তা নিয়েই প্রশ্ন ওঠা। চট্টগ্রাম নগরীর ওয়াসা, নলকূপ ও বাণিজ্যিক জারের পানির মান নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় যে তথ্য উঠে এসেছে, তা তাই অবহেলার সুযোগ রাখে না। এটি আতঙ্ক ছড়ানোর বিষয়ও নয়; বরং বিদ্যমান ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
গবেষণায় নগরের বিভিন্ন এলাকার পানিতে বিপুলসংখ্যক ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। চান্দগাঁওয়ের ওয়াসার অপরিশোধিত পানিতে প্রতি মিলিলিটারে ১৪ হাজার এবং বন্দর এলাকার নলকূপের পানিতে ১৩ হাজার ৫০০ ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। আরো উদ্বেগের বিষয়, শোধনের পরও কিছু নমুনায় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ব্যাকটেরিয়া থেকে গেছে। বন্দর এলাকার নলকূপের শোধিত পানিতে প্রতি মিলিলিটারে প্রায় ১০ হাজার এবং কোতোয়ালির ওয়াসার পানিতে প্রতি ফোঁটায় প্রায় ৪০০ ব্যাকটেরিয়া পাওয়ার তথ্য এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বের।
গবেষণায় রাসায়নিক মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বন্দর ও হালিশহরের নলকূপের পানিতে দ্রবীভূত কঠিন পদার্থ নির্ধারিত মানের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। গবেষকেরা আরো কিছু অজানা অজৈব দূষকের উপস্থিতির আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে জরিপে ওয়াসার পানি ব্যবহারকারীদের ৭৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা পানি পানের উপযোগী মনে করেন না। দুর্গন্ধ, ভাসমান কণা ও অস্বাভাবিক রঙের অভিযোগের পাশাপাশি শোধিত পানি ব্যবহারের পর ডায়রিয়া ও জন্ডিসে আক্রান্ত হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। আক্রান্তদের ৭০ শতাংশের বেশি শিশু—যা বিশেষ উদ্বেগের কারণ।
তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে কোনো পক্ষকে একতরফাভাবে দায়ী না করে প্রয়োজন স্বাধীন ও বৈজ্ঞানিক যাচাই। ওয়াসার বক্তব্য, শোধনাগার থেকে সরবরাহ করা পানিতে ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায় না; গ্রাহকপর্যায়ে পাইপের ফুটো, অপরিষ্কার সংরক্ষণ ট্যাংক কিংবা উন্নয়নকাজে পাইপ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে দূষণ হতে পারে। এই বক্তব্যও গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করা দরকার। কারণ দূষণ শোধনাগারে না গ্রাহকের ঘরে—এই বিতর্কের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কোন পর্যায়ে দূষণ ঘটছে এবং কেন তা শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না।
এ জন্য প্রথমেই শোধনাগার থেকে গ্রাহকের কল পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থাকে পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে। শুধু শোধনাগারের পানি নয়, পাইপলাইন, সংযোগস্থল, সংরক্ষণ ট্যাংক এবং ঘরের পানির নমুনা নিয়মিত পরীক্ষা করে ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা যেতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ ও পুরোনো পাইপলাইন শনাক্ত করে ধাপে ধাপে সংস্কার এবং পাইপলাইন ও নর্দমার দূষিত পানির সংস্পর্শ রোধে কঠোর ব্যবস্থা জরুরি।
একই সঙ্গে বাণিজ্যিক জারের পানি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে নিবন্ধন, স্বাস্থ্যবিধি, মান পরীক্ষা ও নিয়মিত পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। আবাসিক ভবনের পানির ট্যাংক পরিষ্কার রাখার বিষয়েও কার্যকর জনসচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট মানদণ্ড ও তদারকি চালু করা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, গবেষণার ফলাফল ও ওয়াসার পরীক্ষার ফলের মধ্যে পার্থক্য থাকলে তা বিরোধ হিসেবে না দেখে অনুসন্ধানের সুযোগ হিসেবে নেওয়া। প্রয়োজনে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে যৌথভাবে পুনঃপরীক্ষা করা উচিত। কোথায় দূষণ হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট মানচিত্র তৈরি করে সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে।
চট্টগ্রামের প্রায় ৭০ লাখ মানুষের নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা কোনো প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। তাই এখন প্রয়োজন আতঙ্ক নয়, তথ্যভিত্তিক পদক্ষেপ; দায় এড়ানো নয়, জবাবদিহি; বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, সমন্বিত পানিনিরাপত্তা ব্যবস্থা। শোধনাগার থেকে মানুষের ঘর পর্যন্ত পানির প্রতিটি ফোঁটা নিরাপদ—এই নিশ্চয়তা কথায় নয়, নিয়মিত পরীক্ষার নির্ভরযোগ্য প্রমাণেই প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
সানা/আপ্র/৩/৯/২০২৬