পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে যার কণ্ঠের জাদুতে মুগ্ধ কয়েক প্রজন্মের শ্রোতা, সেই কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীনের ৭২তম জন্মদিন আজ। ১৯৫৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকায় জন্ম নেওয়া এই শিল্পী আজ ৭২ বছর পূর্ণ করলেন। দীর্ঘ সংগীতজীবনের সাত দশক পেরিয়েও বাংলা গানের জগতে তাঁর কণ্ঠের আবেদন ও দীপ্তি এখনো অমলিন।
সংস্কৃতিমনা পরিবারে জন্ম নেওয়া সাবিনা ইয়াসমীনের সংগীতের হাতেখড়ি হয় শৈশবেই। তাঁর বাবা লুতফর রহমান ও মা মৌলুদা খাতুন দুজনেই সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাঁচ বোনের মধ্যে ফরিদা ইয়াসমীন, ফওজিয়া খান ও নীলুফার ইয়াসমীনও সংগীতচর্চার সঙ্গে যুক্ত। ফলে পারিবারিক আবহেই গানের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
মাত্র ছয় বছর বয়সে সর্ব পাকিস্তান স্কুল সংগীত প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার অর্জন করেন সাবিনা ইয়াসমীন। শিশুশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার পর ১৯৬৭ সালে ‘আগুন নিয়ে খেলা’ চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকের মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রের গানের জগতে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। সংগীত পরিচালনায় ছিলেন আলতাফ মাহমুদ। এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে সাবিনা ইয়াসমীনের কণ্ঠে ধারণ হয়েছে হাজার হাজার গান। চলচ্চিত্রের গান ছাড়াও আধুনিক, লোকসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত ও গজল—বিভিন্ন ধারার গানে তিনি নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন। কবরী, ববিতা, শাবানা থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রজন্মের বহু নায়িকার পর্দার কণ্ঠ হয়ে উঠেছে তাঁর গান।
প্রেম, বিরহ, আনন্দ, বেদনা কিংবা দেশপ্রেম—প্রতিটি অনুভূতির গানেই সাবিনা ইয়াসমীনের গায়কী পেয়েছে আলাদা মাত্রা। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও মাতৃভূমিকে ঘিরে তাঁর গাওয়া অসংখ্য গান বাঙালির আবেগ ও চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে।
সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৪ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৬ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন সাবিনা ইয়াসমীন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারেও তিনি গড়েছেন অনন্য রেকর্ড। বিভিন্ন সূত্রে তাঁর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্তির সংখ্যা ১৪ বা ১৫ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্যে তাঁকে ১৫ বার শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রেডিও-টেলিভিশনের স্বর্ণযুগ থেকে বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর সময়—যুগ বদলেছে, বদলেছে গানের প্রচারমাধ্যম; কিন্তু বদলায়নি সাবিনা ইয়াসমীনের কণ্ঠের আবেদন। তাঁর গাওয়া পুরোনো গান এখনো নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে সমান জনপ্রিয়। এভাবেই বাংলা সংগীতের ইতিহাসে নিজের জন্য এক উজ্জ্বল, অনন্য অধ্যায় লিখে চলেছেন এই কিংবদন্তি শিল্পী।
জন্মদিন উপলক্ষে তাঁকে নিয়ে বিশেষ আয়োজনও থাকছে। তাঁর দীর্ঘ সংগীতজীবন, শৈশব, শিল্পী হয়ে ওঠার গল্প ও নানা স্মৃতি নিয়ে নির্মিত বিশেষ অনুষ্ঠান ‘শুধু গান গেয়ে পরিচয়’ আজ রাতে প্রচার হওয়ার কথা রয়েছে।
সানা/আপ্র/৪/৯/২০২৬