মোঃ নুর জামাল হক, রংপুর ব্যুরোপ্রধান: একদিকে তিস্তার প্রবল স্রোত, অন্যদিকে ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্ক- এভাবেই দিন কাটছে রংপুরের গঙ্গাচড়ার চরাঞ্চলের মানুষের। বর্ষার পানিতে ফুলে-ফেঁপে ওঠা তিস্তা প্রতিদিনই গিলে খাচ্ছে তীরের মাটি। কাচারীপাড়া থেকে চর বাগজোহরা হয়ে মিনাবাজার পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ভাঙন। নদীর মাত্র ৪৫ মিটার দূরে থাকা চর বাগজোহরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বসতবাড়ি, মসজিদ ও আবাদি জমি ছিল বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে। পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে নদীভাঙন প্রতিরোধকাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার গজঘণ্টা ইউনিয়নের কাচারীপাড়া, চর বাগজোহরা ও মিনাবাজার চরাঞ্চলে কয়েক সপ্তাহ ধরে তিস্তার ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। প্রবল স্রোত ও উজান থেকে নেমে আসা পানির চাপে নদীর ডান তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। এতে হাজারো চরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে চর বাগজোহরা এলাকায় ভাঙন তীব্র হওয়ায় কয়েকটি পরিবার বসতবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে চর বাগজোহরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নদী থেকে বিদ্যালয়টির দূরত্ব এখন মাত্র ৪৫ মিটার। ভাঙন অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ নিয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল কাদের বলেন, “প্রতিদিনই নদী একটু একটু করে এগিয়ে আসছে। বিদ্যালয় থেকে নদীর দূরত্ব দ্রুত কমে যাচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে বিদ্যালয়টি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।”
ভাঙনের শিকার স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সামাদ বলেন, “প্রতি বছরই তিস্তার ভাঙনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়। আমাদের অনেক জমি আগেই নদীতে চলে গেছে। এখন বাড়িঘরও ঝুঁকিতে রয়েছে। আমরা স্থায়ী নদীশাসনের দাবি জানাচ্ছি।”
আরেক বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, “রাত হলেই ভয় লাগে। কখন নদী এসে ঘর নিয়ে যায়, সেই আতঙ্কে থাকি। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি সরানোর চিন্তা করছে।”
এ অবস্থায় চর বাগজোহরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকা রক্ষায় ১০০ মিটার দৈর্ঘ্যের জরুরি নদীভাঙন প্রতিরোধমূলক কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। বালুভর্তি জিওব্যাগসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চলমান প্রতিরোধকাজ বাস্তবায়িত হলে বিদ্যালয়, প্রায় ২০টি বসতঘর, একটি মসজিদ এবং বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে। এর ফলে আপাতত স্বস্তি ফিরবে ঝুঁকিতে থাকা চরবাসীর মধ্যে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, “তিস্তার ভাঙন পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক কাজ চলছে। চর বাগজোহরা এলাকায় ১০০ মিটার প্রতিরক্ষা কাজ সম্পন্ন হলে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বসতবাড়ি সুরক্ষা পাবে বলে আশা করছি।” তিনি বলেন, “এর আগে কাচারীপাড়া, চর বাগজোহরা ও মিনাবাজার এলাকায় ১০০ মিটার করে জরুরি প্রতিরোধমূলক কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এসব কাজের ফলে স্থানীয় বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙনের ক্ষতি থেকে রক্ষা পেয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বিষয়টিও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে।”
গঙ্গাচড়া ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্য বলেন, “চরাঞ্চলের মানুষ বছরের পর বছর ধরে নদীভাঙনের শিকার। সাময়িক প্রতিরোধকাজের পাশাপাশি স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা জরুরি।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা এলেই তিস্তার ভাঙন নতুন নতুন এলাকা গ্রাস করে। এতে অনেক পরিবার ভূমিহীন হয়ে পড়ছে। কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় আবাদি জমি কমে যাচ্ছে; একই সঙ্গে জীবিকা সংকটে পড়ছেন চরাঞ্চলের মানুষ।
চরবাসীর দাবি, জরুরি প্রতিরোধকাজের পাশাপাশি তিস্তা নদীতে স্থায়ী নদীশাসন ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। তাঁদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা না হলে প্রতিবছরই নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের কবলে পড়বে এবং হাজারো মানুষকে ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্ক নিয়ে জীবন কাটাতে হবে।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/৯/৯/২০২৬