একসময় হাম নির্মূলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া বাংলাদেশ এখন ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এই রোগের প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি। গত মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামে সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা ৯৯৯ জনে পৌঁছেছে। রোগীর অতিরিক্ত চাপ, টিকা ও চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট এবং অসুস্থ শিশুদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে দেশের হাসপাতালগুলো।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশের ভয়াবহ হাম পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দেশের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। গত এপ্রিলে জরুরি ভিত্তিতে দেশজুড়ে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হলেও দীর্ঘমেয়াদি এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে হামের সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব চলছে বাংলাদেশে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক গোলযোগের কারণে শিশুদের বড় একটি অংশ নিয়মিত টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একই সময়ে টিকার সরবরাহেও তৈরি হয়েছে চরম সংকট। বিশেষ করে নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে। এই বয়সে নিয়মিত টিকা নেওয়ার সুযোগই অনেক শিশুর হয়নি। ফলে অতিসংক্রামক হামের ভাইরাস সহজেই বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
টিকাদানে ঘাটতিই বড় কারণ: স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে দেশে এক লাখ ৬৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৯ হাজার ৮৩৫ জনের হাম পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হয়েছে। এ সময়ে এক লাখ ৪৬ হাজারের বেশি মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। প্রাদুর্ভাবে ৯৯৯ জনের মৃত্যু হয়েছে; এর মধ্যে ১০০ জনের হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর বিষয়টি পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা হামের এমন বিধ্বংসী পরিস্থিতির পেছনে সরকারের অদূরদর্শিতাকে দায়ী করছেন। তাঁদের ভাষ্য, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুর্বল নজরদারি এবং টিকা ক্রয়নীতিতে আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে পর্যাপ্ত টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি। এতে অসংখ্য শিশু এই অতিসংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষাহীন হয়ে পড়ে।
সোমবার সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ক্রয়নীতি পরিবর্তনের কারণেই বাজারে টিকার তীব্র সংকট তৈরি হয়েছিল। পাশাপাশি ২০২৪ সালে টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে দেওয়া এবং পরের বছর দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি বাতিল করার মাশুল এখন শিশুদের দিতে হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও টিকাদানের ঘাটতিকে এই প্রাদুর্ভাবের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংক্রমণের শুরুর দিকে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
বছরের পর বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ৯৫ শতাংশ টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা সফলভাবে ধরে রেখেছিল বাংলাদেশ। কোভিড মহামারির সময় সাময়িক পতন ছাড়া হাম নির্মূলের পথেই ছিল দেশটি।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও রোগতত্ত্ববিদ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টিকাদানে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় হাম নির্মূলের লক্ষ্য থেকে ছিটকে পড়েছে বাংলাদেশ।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমার জানা মতে, বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত হয়ে এত শিশু মৃত্যুর ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। এক বছরে এত রোগী দেখার অভিজ্ঞতাও আমাদের নেই। এটি একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা। আর দুঃখজনক হলো, এর বলি হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুরা।’
তিনি বলেন, পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে অবিলম্বে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনা, টিকাদান বাড়ানো এবং জোরদার জনসচেতনতা তৈরির কোনো বিকল্প নেই।
হাসপাতালে উপচে পড়ছে রোগীর চাপ: হামের রোগীর সংখ্যা যখন আকস্মিকভাবে বেড়েছে, তখন একই সঙ্গে বাড়ছে ডেঙ্গুও। ফলে আগে থেকেই চাপে থাকা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর তৈরি হয়েছে অতিরিক্ত চাপ। হামের রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এরই মধ্যে ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মঙ্গলবার এক দিনেই ডেঙ্গুতে নয়জনের মৃত্যু এবং এক হাজার ৫৭১ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার রেকর্ড হয়েছে, যা এ বছরের সর্বোচ্চ।
রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা বলেন, রোগীর চাপ এত বেশি যে সবাইকে শয্যা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। হামের রোগীদের জন্য ৬০টি শয্যা নির্ধারিত থাকলেও অনেক শিশুকে মেঝেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, শিশুদের পানিশূন্যতা দূর করার জন্য অপরিহার্য শিশুবান্ধব স্যালাইনের তীব্র সংকট পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। এক হাজার ৩৫০ শয্যার এই হাসপাতালে বর্তমানে দুই হাজার ৩৫০ জনেরও বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।
দুর্ভোগে সাধারণ পরিবার: এই প্রাদুর্ভাব সাধারণ পরিবারগুলোর জন্যও সীমাহীন দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সপ্তাহের পর সপ্তাহ অনিশ্চয়তা, এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছোটাছুটি এবং চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
৩৫ বছর বয়সী গৃহকর্মী নাসিমা বেগম বলেন, দুই মাস আগে তাঁর ১৩ মাস বয়সী ছেলে হামে আক্রান্ত হয়। চারটি হাসপাতালে ঘুরেও শয্যা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত একটি হাসপাতালে ভর্তি করাতে সক্ষম হন। ১০ দিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেও ছেলের ঘন ঘন জ্বর আসা বন্ধ হয়নি।
নাসিমা বলেন, অসুস্থ থাকার কারণে তাঁর ছেলে নির্দিষ্ট সময়ে টিকা নিতে পারেনি। পরে টিকাদান কেন্দ্রে গেলে তাঁকে জানানো হয়, টিকা নেই। অথচ তাঁর বড় চার সন্তানই যথাসময়ে টিকা পেয়েছিল।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন কারখানাশ্রমিক মোহাম্মদ রিপন। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরপরই তাঁর আট মাস বয়সী মেয়ের শরীরে র্যাশ ও হামের উপসর্গ দেখা দেয়। সঠিক চিকিৎসার আশায় একের পর এক হাসপাতালে ঘুরে শেষ পর্যন্ত একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে মেয়েকে ভর্তি করেন তিনি।
ক্ষোভ প্রকাশ করে রিপন বলেন, ‘আমরা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরছি। কোথাও কোনো স্পষ্ট বা সঠিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।’
জরুরি ভিত্তিতে শুরু হওয়া হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে এরই মধ্যে এক কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনো অনেক শিশু টিকাদান কর্মসূচির বাইরে রয়েছে। তাদের জন্য বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তন ও দ্রুত নগরায়ণের কারণে ডেঙ্গুর বিস্তার একদিকে যেমন স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামগ্রিক সক্ষমতাকেই বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক এই রোগের বিরুদ্ধে টিকার দুটি মাত্রা নিলে অত্যন্ত কার্যকর সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব। হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে নাসিমা বেগম বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, এত চিকিৎসার খরচ চালানোর ক্ষমতা আমাদের নেই। আল্লাহর কাছে একটাই দোয়া, ছেলেটা যেন বাঁচে। কোনো মা যেন তার সন্তানকে এভাবে কষ্ট পেতে বা মরতে না দেখে।’ সূত্র: রয়টার্স
সানা/আপ্র/৯/৯/২০২৬