মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে ভাদ্র মাসের শুরুতেই বাজারে উঠতে শুরু করেছে পাকা তাল। মিষ্টি ঘ্রাণে মৌ মৌ করছে হাট-বাজার। ঘরে ঘরে তৈরি হচ্ছে তালের পিঠা-পুলি, পায়েস, বড়াসহ নানা মুখরোচক খাবার। কেউ পাকা তালের ঘন মিষ্টি রস কাঁচাই খাচ্ছেন, আবার কেউ সিদ্ধ করে তা দিয়ে তৈরি করছেন পিঠা ও বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার। তালের বীজের শাঁসও অনেকের কাছে বেশ প্রিয়।
দুই-তিন মাস আগে কাঁচা তালের রসালো শাঁস রসনা মিটিয়েছে মানুষের। এখন পাকা তালের রস দিয়ে শহর-গ্রাম সবখানেই তৈরি হচ্ছে পিঠা, পায়েস, পাকোয়ান, তালমিছরি, তালমাখনা ও তালের বড়াসহ নানা ধরনের খাবার। ভাদ্রের বাতাসে মিশে থাকা পাকা তালের মিষ্টি ঘ্রাণ মনে করিয়ে দিচ্ছে গ্রামবাংলার চিরচেনা ঋতুচিত্র।
গ্রামবাংলার অতি পরিচিত এই মৌসুমি ফল এখন শহর ও গ্রামের হাট-বাজারে উঠতে শুরু করেছে। বাজারে তাল দেখলেই অনেকের মনে পড়ে যায় শৈশবের দিনগুলোর কথা - পাকা তালের পিঠা-পুলি, তালের বড়া, পায়েস আর মিষ্টি রসের সেই স্বাদ।
দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলেই কমবেশি তালগাছ দেখা যায়। সমতল, পাহাড় কিংবা হাওর-বাঁওড় - সব এলাকাতেই একসময় তালগাছ ছিল গ্রামীণ প্রকৃতির অন্যতম পরিচিত অনুষঙ্গ। ১৫-২০ বছর আগেও দেশের বিভিন্ন স্থানে সারি সারি তালগাছের দেখা মিলত। কালের আবর্তে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। তালগাছ এখন অনেকটাই অস্তিত্ব সংকটে।
বৃক্ষরোপণ অভিযানসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অন্যান্য গাছ লাগানো হলেও তালগাছ রোপণে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অপরিকল্পিতভাবে তালগাছ কাটা এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মাঠের ধারে ও গ্রামীণ পথের পাশে আগের মতো সারি সারি তালগাছও চোখে পড়ে না। হারিয়ে যাচ্ছে তালগাছে বাবুই পাখির বাসা বাঁধার সেই মনকাড়া দৃশ্যও। তবে সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এলেও তালের প্রতি মানুষের আগ্রহ এখনো কমেনি।
ঘোড়াঘাট উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে বর্তমানে পাকা তাল বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে। আকারভেদে স্থানীয় বাজারে প্রতিটি পাকা তাল প্রায় ২০ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তালের পাশাপাশি মৌসুমে তালের শাঁসেরও ভালো চাহিদা রয়েছে।
তাল বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন জানান, আগে গ্রামের রাস্তার পাশে কিংবা বাড়ির উঠানে সহজেই তাল পাওয়া যেত। এখন তালগাছ কমে যাওয়ায় আগের মতো তাল পাওয়া যায় না। ফলে বাজারে তালের দামও বেড়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে তাল বিক্রি করে অনেক ছোট ব্যবসায়ী মৌসুমি আয় করছেন।
ক্রেতাদের অনেকের মতে, তাল শুধু একটি মৌসুমি ফল নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও মানুষের শৈশবের স্মৃতি। পাকা তাল দিয়ে তৈরি বড়া, পিঠা, পায়েসসহ বিভিন্ন খাবারের স্বাদ এখনো মানুষের কাছে সমান জনপ্রিয়।
তালগাছ শুধু ফলই দেয় না, এর রয়েছে বহুমুখী ব্যবহার। তালপাতা দিয়ে হাতপাখা, টুপি, ঝুড়ি, চাটাই, মাদুর, বেড়া ও বিভিন্ন খেলনা তৈরি হয়। তালগাছের কাঠও শক্ত ও আঁশযুক্ত হওয়ায় সহজে পচে বা নষ্ট হয় না। এই কাঠ দিয়ে ছোট ডিঙি নৌকা, ছাতার বাঁট, লাঠি, বাক্স, পাপোশ, কয়ারসহ বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করা হয়।
তবে তালগাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে এই ঐতিহ্যবাহী ফলের সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ফল দেওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও তালগাছ গুরুত্বপূর্ণ। তাই তালগাছ সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন করে তালবীজ ও চারা রোপণের উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
সানা/আপ্র/১১/৯/২০২৬