গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

এআইভিত্তিক দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার

প্রযুক্তি ডেস্ক

প্রযুক্তি ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:৫৩ পিএম, ২৬ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ২৩:২৩ এএম ২০২৬
এআইভিত্তিক দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
ছবি

ছবি সংগৃহীত

বিশ্ব এখন এক নতুন প্রযুক্তিগত বিপ্লবের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। বাষ্পীয় ইঞ্জিন প্রথম শিল্প বিপ্লব, বিদ্যুৎ দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব ও ইন্টারনেট তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। আর চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। এটি আর কেবল কম্পিউটার বিজ্ঞানের একটি শাখা নয়; বরং অর্থনীতি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাষ্ট্র পরিচালনা ও জাতীয় নিরাপত্তাসহ প্রায় প্রতিটি খাতের রূপান্তরের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। এ বাস্তবতা অনুধাবন করেই বাংলাদেশ সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এ বিষয় নিয়েই এবারের প্রযুক্তি পাতার প্রধান ফিচার

সম্প্রতি সাভারের ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা ল্যাব’ এবং ‘এআই প্রজেক্ট কম্পিটিশন-২০২৬’-এর উদ্বোধনকালে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে এবং গবেষণা-উদ্ভাবনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।’ তার মতে, এআই শুধু একটি প্রযুক্তি নয়; ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন এবং জাতীয় প্রতিযোগিতা সক্ষমতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। সরকারের লক্ষ্য আগামী পাঁচ বছরে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। এ লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা, উদ্ভাবনী প্রকল্প, স্টার্টআপ উন্নয়ন, তৃণমূল পর্যায়ে প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তি অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে- যা জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি নির্মাণের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।

চ্যাটজিপিটি, জেমিনি, ক্লড ও কোপাইলটের মতো প্রযুক্তি এখন আর কেবল প্রযুক্তিপ্রেমীদের কৌতূহলের বিষয় নয়; শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা, গণমাধ্যম, গবেষণা ও সরকারি সেবার বাস্তব কর্মপরিবেশে এগুলোর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। চিকিৎসক রোগ নির্ণয়ে, শিক্ষক পাঠদানে, প্রকৌশলী নকশা প্রণয়নে, ব্যাংকার ঝুঁকি বিশ্লেষণে এবং গবেষক তথ্য বিশ্লেষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নিচ্ছেন। তাই অনেক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ একে ‘নতুন যুগের বিদ্যুৎ’ বলে অভিহিত করেন। যেমন বিদ্যুৎ একসময় শিল্প ও অর্থনীতির প্রতিটি খাতে বিপ্লব ঘটিয়েছিল, তেমনি আগামী দিনের প্রায় প্রতিটি প্রযুক্তি ও উৎপাদন ব্যবস্থার কেন্দ্রেও থাকবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এটি শুধু উৎপাদনশীলতা বাড়াবে না, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও দ্রুত, তথ্যনির্ভর ও নির্ভুল করে তুলবে।

গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা তৈরিতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। ওপেনএআই, গুগল, মাইক্রোসফট, মেটা, অ্যানথ্রপিক এবং এনভিডিয়ার মতো প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক এআই প্রযুক্তির নেতৃত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে চীন ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শীর্ষ শক্তি হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে বিপুল বিনিয়োগ করছে এবং স্মার্ট সিটি, শিল্প স্বয়ংক্রিয়তা, স্বাস্থ্যসেবা ও স্বয়ংচালিত যানবাহনে ব্যাপকভাবে এআই ব্যবহার করছে। ভারত জাতীয় এআই মিশনের আওতায় কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বহুভাষিক প্রযুক্তি উন্নয়নে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। একইভাবে সিঙ্গাপুর সরকারি সেবা ও স্মার্ট সিটি ব্যবস্থাপনায় এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রশাসনিক আধুনিকায়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সফল প্রয়োগ ঘটাচ্ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি কোনো একক খাতের প্রযুক্তি নয়; বরং বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেটের মতো একটি সাধারণ উদ্দেশ্যভিত্তিক প্রযুক্তি, যা অর্থনীতি ও সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, শিল্প, ব্যাংকিং, পরিবহন, বিচার, প্রশাসন, গণমাধ্যম, প্রতিরক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।

শিক্ষা খাতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক পাঠদান, স্বয়ংক্রিয় মূল্যায়ন, গবেষণা সহায়তা এবং স্মার্ট ক্লাসরুম পরিচালনায় এআই নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। স্বাস্থ্যসেবায় রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা পরিকল্পনা, ওষুধ উদ্ভাবন ও টেলিমেডিসিনে এটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। কৃষিতে স্যাটেলাইট চিত্র, ড্রোন ও সেন্সর প্রযুক্তির মাধ্যমে জমির অবস্থা বিশ্লেষণ, রোগবালাই শনাক্তকরণ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং ফলন বৃদ্ধিতে এআই কার্যকর ভূমিকা রাখছে। শিল্প উৎপাদনে স্মার্ট ফ্যাক্টরি, রোবটনির্ভর উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনাতেও এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। একইভাবে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে জালিয়াতি শনাক্তকরণ, ঋণের ঝুঁকি মূল্যায়ন, গ্রাহকসেবা, ডিজিটাল লেনদেনের নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগ বিশ্লেষণে এআই নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রশাসনিক সেবায় ভূমি ব্যবস্থাপনা, কর প্রশাসন, স্মার্ট ট্রাফিক, নাগরিক সেবা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় এর ব্যবহার বাড়ছে। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করছে না; রাষ্ট্রীয় সেবার দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও শক্তিশালী করছে।

বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। গত এক দশকে ডিজিটাল অবকাঠামো, মোবাইল ইন্টারনেট, ডিজিটাল আর্থিক সেবা, ই-গভর্ন্যান্স এবং তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের যে ভিত্তি গড়ে উঠেছে, তার ওপর দাঁড়িয়ে সরকার এখন এআইভিত্তিক দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এই ধারাবাহিকতায় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে প্রতিষ্ঠিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা ল্যাব দেশের গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিনির্ভর মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সরকার তৃণমূল পর্যায়ে এআই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সম্প্রসারণ এবং স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সুবিধা বিস্তারের উদ্যোগও নিয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাজধানীকেন্দ্রিক প্রযুক্তি উন্নয়নের পরিবর্তে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণরাও সমানভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে। ফলে ডিজিটাল বৈষম্য হ্রাস পাবে এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে ওঠার ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসারের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কও রয়েছে। কেউ মনে করেন এআই মানুষের কর্মসংস্থান কমিয়ে দেবে, আবার অন্যদের মতে এটি নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করবে। বাস্তবতা হলো, প্রতিটি শিল্পবিপ্লবের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও কিছু প্রচলিত পেশার অবসান ঘটালেও নতুন দক্ষতাভিত্তিক পেশার সৃষ্টি করবে।

দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী তরুণ। এই বিপুল জনশক্তিকে আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তিগত দক্ষতায় গড়ে তুলতে পারলে তারা শুধু দেশীয় নয়, বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। সরকারের আগামী পাঁচ বছরে আইসিটি খাতে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য তাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থার মধ্যে কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে কিছু মৌলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাও জরুরি। দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি, গবেষণায় সীমিত বিনিয়োগ, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং অবকাঠামোর অভাব, বাংলা ভাষাভিত্তিক এআই উন্নয়ন, তথ্যের নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ডিপফেক এবং এআইয়ের নৈতিক ব্যবহার- এসব বিষয়ে সময়োপযোগী নীতিমালা ও কার্যকর আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় প্রযুক্তির সুফলের পাশাপাশি নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতের নয়, বর্তমানের প্রযুক্তি। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ ওই সম্ভাবনারই প্রতিফলন। এখন প্রয়োজন ধারাবাহিক নীতিগত সমর্থন, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং গবেষণাভিত্তিক দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার মাধ্যমে এই অভিযাত্রাকে আরও গতিশীল করা।

কেএমএএ/আপ্র/২০.০৭.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

এআইয়ের পরিণতি ঠেকাতে কেউ প্রস্তুত নয়
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এআইয়ের পরিণতি ঠেকাতে কেউ প্রস্তুত নয়

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতির সুদূরপ্রসারী পরিণতি মোকাবিলায় বিশ্ব এখনো প্রস্তুত নয় বলে সতর্ক ক...

এআই এজেন্টের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে বাড়ছে নিরাপত্তা উদ্বেগ
০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এআই এজেন্টের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে বাড়ছে নিরাপত্তা উদ্বেগ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন প্রতিনিধি বা এআই এজেন্ট ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। এসব এজেন্ট নিজে পরিকল্পনা করতে...

স্মার্টফোন থেকে খুলে নেওয়া যাবে ক্যামেরা, নতুন চমক
০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স্মার্টফোন থেকে খুলে নেওয়া যাবে ক্যামেরা, নতুন চমক

একঘেয়ে কালো ও আয়তাকার স্মার্টফোনের প্রচলিত নকশা থেকে বেরিয়ে এবার ভিন্নধর্মী একটি ডিভাইস নিয়ে এসেছে ফ...

ম্যাকবুক নিও’র প্রতিদ্বন্দ্বী ল্যাপটপ আনছে লেনোভো
০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ম্যাকবুক নিও’র প্রতিদ্বন্দ্বী ল্যাপটপ আনছে লেনোভো

ম্যাকবুক নিও ও ডেল এক্সপিএস ১৩-এর মতো জনপ্রিয় বিভিন্ন ল্যাপটপকে টক্কর দিতে কেবল ৭০০ ডলারে বাজারে আসছ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই